প্লেন নয়, এবার সোজা ট্রেনে চেপে রাশিয়া! ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেলপথ গড়তে বিরাট প্রস্তাব মস্কোর

আকাশপথ বা জলপথ পেরিয়ে নয়, এবার ভারতের সঙ্গে সরাসরি স্থলপথে রেল যোগাযোগ গড়ে তুলতে চাইছে রাশিয়া (Russia)। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করতে এবার সুদূর রাশিয়া থেকে সোজা ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেলপথ তৈরির এক অভিনব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে এনেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা কমাতে এবং যেকোনো ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প স্থলপথ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। আর সেই লক্ষ্যেই রাশিয়া থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।
কোন পথে ভারতে আসতে পারে এই রেল?
রুশ সংবাদ সংস্থা TASS-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী এই মেগা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাবিত সম্ভাব্য রুটটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। রাশিয়া থেকে শুরু হয়ে এই রেলপথটি তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত ভারতে এসে পৌঁছতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে প্রাথমিক পরিকল্পনার স্তরে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট বা চূড়ান্ত রুট নির্ধারিত হয়নি। দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনো যাত্রীবাহী ট্রেন চালুরও কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি ট্রেনের নাম, টিকিটের দাম, বা পরিষেবা চালুর কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণও ঘোষণা করা হয়নি।
হঠাৎ কেন এমন রেলপথ চাইছে রাশিয়া?
এই অভিনব প্রস্তাবের নেপথ্যে রয়েছে মূলত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণের পথ হলো হরমুজ প্রণালী ও বসফরাস প্রণালী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং এলএনজি (LNG) পরিবহণের প্রায় ২০ শতাংশই এই জলপথগুলির ওপর দিয়ে সম্পন্ন হয়।
ফলে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে হরমুজ প্রণালী বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এই ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতেই সমুদ্রপথের পাশাপাশি একটি সুরক্ষিত বিকল্প স্থলপথ তৈরি করতে চাইছে রাশিয়া।
ভারতের কী লাভ হতে পারে?
যদি ভবিষ্যতে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা ভারতের জন্যও অত্যন্ত কৌশলগত ও লাভজনক হতে পারে। এর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সরাসরি স্থল যোগাযোগ যেমন সুদৃঢ় হবে, তেমনই মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে ভারী পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে এই করিডর গেম-চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হলে পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে।
তবে প্রকল্পটির যেমন সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনই এর বাস্তবায়নে রয়েছে বিরাট চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল দেশগুলির ওপর দিয়ে রেলপথ নির্মাণ, একাধিক দেশের সঙ্গে নিখুঁত রাজনৈতিক সমন্বয় এবং বিপুল পরিমাণ পরিকাঠামো খরচ—সব মিলিয়ে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ও কঠিন প্রক্রিয়া। তা সত্ত্বেও, ভারতের দিকে স্থলপথে রেল সংযোগ স্থাপনের চিন্তা ভাবনা শুরু করার এই প্রস্তাবটিই আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক বিরাট মোড় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।