শ্বাসনালি ও রক্তনালির ওপর মারাত্মক চাপ! বিরল লিম্ফ্যাঞ্জিওমা অস্ত্রোপচার করে পুনর্জীবন পেলেন ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি

দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ঘাড়ের ডান দিকে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা একটি ফোলাকে সাধারণ বিষয় ভেবে অবহেলা করেছিলেন কলকাতার বাসিন্দা বছর ছেষট্টির গৌতম বিশ্বাস। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকমাসে সেই ফোলাটি দ্রুত আকারে বৃদ্ধি পেতে শুরু করায় চিন্তার ভাঁজ পড়ে। পরবর্তীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড় হয়—গৌতমবাবুর ঘাড়ের ভেতরে তৈরি হয়েছে প্রায় ১০×১০×১০ সেন্টিমিটার আকারের একটি বিশাল তরলপূর্ণ টিউমার!
সল্টলেকের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে এক জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেই বিরল টিউমার সফলভাবে সম্পূর্ণ অপসারণ করেছেন। বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ওই রোগী।
কী ছিল এই টিউমারের জটিলতা? হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২ জুলাই ওই রোগী ঘাড়ে বড় আকারের ফোলা নিয়ে ভর্তি হন। ২৩ মে করানো কনট্রাস্ট-এনহ্যান্সড সিটি স্ক্যানে ধরা পড়ে যে টিউমারটি ডান দিকের কমন করোটিড ধমনি এবং থাইরয়েড গ্রন্থির অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছে। একইসঙ্গে সেটি ইন্টারনাল জুগুলার শিরার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছিল। এমনকি টিউমারের চাপে রোগীর শ্বাসনালি ও স্বরযন্ত্র সামান্য বাম দিকে সরে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের আশঙ্কা ছিল, টিউমারটি আরও বড় হলে ভবিষ্যতে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, গিলতে সমস্যা এবং ঘাড়ে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হতে পারত।
প্রাথমিক পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা এটিকে ‘লিম্ফ্যাঞ্জিওমা’ (Lymphangioma) বলে সন্দেহ করেন। এটি লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের একটি বিরল, অ-ক্যানসারজনিত বিকৃতি। সাধারণত ছোট বয়সেই এই সমস্যা ধরা পড়ে, তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার ও সাফল্য: ইএনটি ও হেড অ্যান্ড নেক বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিৎসক কৌশিক দাস এবং উশরিন বোস-এর নেতৃত্বে এবং সিনিয়র অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট তুষার কান্তি ঘোষ ও তাঁর দলের সহযোগিতায় এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
অস্ত্রোপচারের সময় দেখা যায়, টিউমারটি একটি বহু প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট তরলপূর্ণ সিস্ট, যা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী করোটিড ধমনি, ইন্টারনাল জুগুলার শিরা এবং ভেগাস স্নায়ুর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগুলিকে ঘিরে রয়েছে। সামান্য ভুলেই বড় ধরনের বিপদ বা স্নায়ুক্ষতি হতে পারত। তবে অত্যন্ত নিখুঁত ও সতর্ক কৌশলে আশপাশের রক্তনালি ও স্নায়ুগুলিকে অক্ষত রেখেই সম্পূর্ণ টিউমারটি বের করে আনে চিকিৎসকদের দল। হিস্টোপ্যাথলজিক্যাল পরীক্ষায় লিম্ফ্যাঞ্জিওমার উপস্থিতি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়।
চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা: অস্ত্রোপচারের মাত্র দু’দিনের মাথায় ড্রেন খুলে দেওয়া হয় এবং রোগী স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে শুরু করেন। সফল ফলো-আপের পর তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ডিসচার্জ করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, ঘাড়ে বা শরীরের অন্য কোথাও দীর্ঘমেয়াদি কোনো ফোলা দেখলে তাকে কখনই অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে ফোলা যদি হঠাৎ দ্রুত আকারে বাড়তে শুরু করে, তবে সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।