চিনের ওপর এই অর্থনৈতিক নির্ভরতা কি সহজে কমানো সম্ভব? রাজ্যসভায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করল বাণিজ্য মন্ত্রক

দেশে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে এবং বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিগত কয়েক বছর ধরে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘পিএলআই’ (PLI)-এর মতো একাধিক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে কেন্দ্র সরকার। কিন্তু এত সব উদ্যোগ ও কঠোর পদক্ষেপ সত্ত্বেও জিনপিংয়ের দেশের ওপর ভারতের বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি রাজ্যসভায় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে চিন থেকে ভারতের আমদানি প্রায় ৩৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে!

আমদানি ও বাণিজ্য ঘাটতির পরিসংখ্যান কী বলছে? বাণিজ্য মন্ত্রকের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী—

  • আমদানির বৃদ্ধি: ২০২১-২২ অর্থবছরে চিন থেকে ভারত মোট ৯৪.৫৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছিল। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসে সেই অঙ্ক একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১.৬৩ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে চিনা পণ্যের আমদানি প্রায় ৩৯% বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতের মোট পণ্য আমদানিতে চিনের হিস্যা ১৫.৪৩% থেকে বেড়ে ১৬.৯৬%-এ গিয়ে ঠেকেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো অন্যান্য বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের তুলনায় চিন থেকে প্রায় দ্বিগুণ পণ্য কিনছে ভারত।

  • বাণিজ্য ঘাটতির রেকর্ড: আমদানির এই লাগামছাড়া বৃদ্ধির ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতিও (Trade Deficit) লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ২০২১-২২ সালে ভারত-চীন বাণিজ্য ঘাটতি যেখানে ৭৩.৩১ বিলিয়ন ডলার ছিল, তা ৫ বছরের মাথায় ৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রেকর্ড গড়ে ১১২.১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

চিনের ওপর এই জিঘাংসা নির্ভরতা কেন কমছে না? ভারত প্রযুক্তিগত ও উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা চালালেও, কিছু মৌলিক কাঠামোগত কারণে চিনের ওপর থেকে নির্ভরতা পুরোপুরি বা দ্রুত কমানো সম্ভব হচ্ছে না। যেমন— ১. কাঁচামাল বা মধ্যবর্তী পণ্যের অভাব: ভারতের ওষুধ শিল্প (Pharmaceuticals), ইলেকট্রনিক্স, রাসায়নিক (Chemicals) এবং বৈদ্যুতিক যান (EV) বা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মতো ক্ষেত্রগুলি তাদের উৎপাদনের জন্য বহু পরিমাণে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (APIs) এবং বিরল খনিজ বা প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য সরাসরি চিনের ওপর নির্ভরশীল। ভারতে ফিনিশড গুডস বা চূড়ান্ত পণ্য তৈরি হলেও তার মূল কাঁচামালটি চিনা আমদানির ওপর ভিত্তি করেই চলে। ২. কম খরচে লজিস্টিক ও স্কেল: উৎপাদনের ক্ষেত্রে চিনের পরিকাঠামো এবং বিশাল সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে রাতারাতি প্রতিযোগিতা করা ভারতের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কম খরচে দ্রুত উপাদান পাওয়ার সুবিধা থাকায় অনেক ভারতীয় প্রস্তুতকারক সংস্থাও চিনা আমদানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।

সব মিলিয়ে, আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্য অর্জনে নীতিগত ও উৎপাদন ক্ষেত্রে বহু অগ্রগতি হলেও, সাপ্লাই চেইনের গভীরে প্রোথিত এই চিন-নির্ভরতা ভাঙতে ভারতকে দীর্ঘমেয়াদি ও আরও সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *