যন্তর মন্তরে হিংসার পিছনে পাকিস্তানি যোগ! হাজার হাজার ভুয়ো প্রোফাইল নিয়ে বিরাট তথ্য ফাঁস দিল্লি পুলিশের

দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র সাম্প্রতিক বিক্ষোভ চলাকালীন ছড়িয়ে পড়া চরম হিংসার পিছনে এবার এক গভীর ও সুপরিকল্পিত ডিজিটাল ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস হলো। দিল্লি পুলিশের সাইবার সেল এবং ফরেনসিক দলের দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ধরে চালনো নিবিড় কারিগরি তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ জানতে পেরেছে, ইন্টারনেট মাধ্যমকে ব্যবহার করে এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি সহিংস ঘটনা হিসেবে তুলে ধরার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। এই পুরো নাশকতার পেছনে হাজার হাজার ভুয়ো সোশাল মিডিয়া প্রোফাইল এবং বিদেশি বট নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

২০ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে পরিকল্পিত বিভ্রান্তি
দিল্লি পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আপত্তিকর রিলস, উসকানিমূলক ভিডিয়ো এবং বিতর্কিত মন্তব্যের এক প্রকার বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে জানা গিয়েছে, এই বিষয়বস্তুগুলি স্বাভাবিকভাবে ছড়ায়নি; বরং একটি নির্দিষ্ট বট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অ্যালগরিদমে কারচুপি করে অত্যন্ত দ্রুত সেগুলিকে ভাইরাল করা হয়।

এর জেরে যন্তর মন্তর, জনপথ, টলস্টয় মার্গ এবং পার্লামেন্ট মার্গে টানা চার দিন ধরে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি হয়। এমনকি সেই সময়ে দুষ্কৃতকারীরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশকর্মী এবং সংবাদ সংগ্রহের কাজে উপস্থিত সাংবাদিকদের লক্ষ্য করেও নির্বিচারে পাথর ছোড়ে।

মেটা, গুগল ও এক্স-কে তলব এবং নোটিশ পুলিশের
এই ডিজিটাল ষড়যন্ত্রের মূল উৎস খুঁজে বের করতে দিল্লি পুলিশের সাইবার সেল বিশ্বের প্রধান প্রযুক্তি সংস্থাগুলি— যথা মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম), গুগল এবং এক্স (পূর্বের টুইটার)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিশ পাঠিয়েছে। পুলিশ ওই সংস্থাগুলির কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চেয়েছে:

সার্ভার লগ ও আইপি অ্যাড্রেস: ভুয়ো প্রোফাইল ও বট অ্যাকাউন্টগুলি পরিচালনার নেপথ্যে থাকা মূল সার্ভারের সঠিক অবস্থান।

লগ-ইন ইতিহাস: ঠিক কোন স্থান এবং কোন ডিভাইস থেকে এই অ্যাকাউন্টগুলিতে লগ-ইন করা হয়েছিল।

কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক তথ্য: হাজার হাজার অ্যাকাউন্ট কি কোনও নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় টুল বা সার্ভারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল?

মালিকানার বিবরণ: সন্দেহজনক প্রোফাইলগুলি তৈরি ও পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের প্রাথমিক পরিচয়।

‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং পাকিস্তানি হ্যান্ডেলের সংযোগ
এই তদন্তের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং উদ্বেগজনক দিকটি হলো, এই ডিজিটাল প্রচারের প্রধান সূত্রগুলি দেশের সীমানার বাইরে পরিচালিত ইন্টারনেট মিডিয়া অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৮০টি পাকিস্তানি সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলি এর আগে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময়ও ভারত-বিরোধী এবং উসকানিমূলক বিষয়বস্তু ছড়ানোর কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব ও শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার লক্ষ্যে বিদেশি শক্তি বা সমাজবিরোধীদের এই সহায়তা করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

সিজেপি (CJP) নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি
এই ডিজিটাল ষড়যন্ত্রের জাল ফাঁস হওয়ার পর এবার সিজেপি-র শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে দিল্লি পুলিশ। সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং কর্মী আশুতোষ রাঙ্কাকে নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং সংগঠনের অন্যান্য পদাধিকারীদেরও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হচ্ছে। বর্তমানে আইনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, এই পুরো হিংসার ঘটনায় ইতিমধ্যে প্রায় ২,৮৭৩ জন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে।

তহবিলের উৎস ও মূল পরিকল্পনাকারীর সন্ধান
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে গভীর নজর দিয়ে খতিয়ে দেখছেন যে, এই বিশাল ডিজিটাল প্রচারে কে বা কারা অর্থায়ন করেছে এবং বিক্ষোভকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ বা লজিস্টিকস কোথা থেকে সরবরাহ করা হয়েছিল। পুলিশ আধিকারিকরা এই বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে, এটি কোনও সাধারণ বা স্বতঃস্ফূর্ত জনবিক্ষোভ ছিল না, বরং একটি সুপরিকল্পিত নাশকতার ছক ছিল। এই পুরো ডিজিটাল ও ফিল্ড পর্যায়ের নেটওয়ার্কের আসল মাস্টারমাইন্ড বা মূল পরিকল্পনাকারীকে ধরতে পুলিশ এখন আর্থিক লেনদেন এবং সন্দেহভাজনদের কল ডিটেইল রেকর্ড (CDR) নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে।

Saheli Saha
  • Saheli Saha

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *