জোড়াফুল হাতছাড়া হলে কি ‘সূর্যমুখী’ হবে মমতার নতুন অস্ত্র? বাংলার রাজনীতিতে তুঙ্গে জল্পনা

বাঙালির রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) ঐতিহ্যবাহী নির্বাচনী প্রতীক— জোড়াফুল। দলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন এবং বিদ্রোহী শিবিরের তৎপরতার জেরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এই প্রতীক শেষ পর্যন্ত কার দখলে থাকবে? আইনি লড়াইয়ে পরিস্থিতি যদি তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) প্রতিকূলে যায়, তবে তিনি ঠিক কোন প্রতীক নিয়ে আগামী দিনে নির্বাচনী ময়দানে লড়বেন? রাজনৈতিক মহলে এই নিয়ে জল্পনার পারদ চড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন মহলের গুঞ্জন বলছে, সমস্ত আইনি লড়াই ব্যর্থ হলে বিকল্প হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনায় জোরালোভাবে উঠে আসতে পারে ‘সূর্যমুখী ফুল’-এর প্রতীক।
জল্পনার সূত্রপাত ও বিদ্রোহী শিবিরের দাবি
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক হাতছাড়া হওয়া নিয়ে এই জল্পনার সূত্রপাত হয়েছে মূলত বিদ্রোহী শিবিরের কিছু চাঞ্চল্যকর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি সর্বভারতীয় স্তরে চর্চিত নতুন রাজনৈতিক দল NCPI-তে যোগ দেওয়া তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তাঁর দাবি, জোড়াফুল প্রতীক এবং দলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়ে তিনি নাকি স্বয়ং বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা সেরে ফেলেছেন।
এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় খোলামেলাভাবে জানান,
“প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, অমিত শাহকে বলেছি, আজ ভুপেন যাদব যখন ঘরে আসেন, তাঁকেও আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল, স্বীকৃতি কবে হচ্ছে। উনি বললেন, জোড়াফুলটা আগে কে পাবে, সেটা ঠিক হয়ে যাক, খুব শীঘ্রই হয়ে যাবে। একটা মিনিমাম সময় লাগছে।”
বিদ্রোহী শিবিরের এই ধরনের প্রকাশ্যে দলীয় নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর পরেই বিকল্প প্রতীক নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে।
কেন উঠে আসছে ‘সূর্যমুখী’ ফুলের নাম?
রাজনৈতিক সূত্রের খবর, সম্ভাব্য নতুন প্রতীক হিসেবে হঠাৎ করেই সূর্যমুখী ফুলের নাম উঠে আসার পেছনে কেবল নান্দনিক বা শৌখিন কারণ নেই, এর নেপথ্যে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল। বর্তমান ডিজিটাল যুগে তরুণ ভোটারদের একটি বিরাট অংশ, বিশেষ করে Gen Z প্রজন্মের কাছে সূর্যমুখী ফুলের এক অন্যরকম গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। আগামী দিনে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সঙ্গে রাজনৈতিক আবেগ ও মানসিক সংযোগ স্থাপন করতে এই প্রতীকটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
সাম্প্রতিক অতীতে ভারতসহ গোটা বিশ্বজুড়েই জেন জি প্রজন্মের নানা আন্দোলন ও সামাজিক কর্মকাণ্ড জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে এই ফুলটি আশাবাদ, ইতিবাচক মানসিকতা এবং শক্তির একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে। আজকের দিনে ভালোবাসা প্রকাশ করা, প্রিয়জনকে শুভেচ্ছা জানানো, কিংবা শিক্ষক ও পরিচিতদের সম্মান জানানোর মতো বিভিন্ন শুভ উপলক্ষে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সূর্যমুখী ফুল ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, একটি রাজনৈতিক দল যদি সরাসরি তরুণ সমাজের মন জয় করতে চায়, তবে এই প্রতীকটিকে হাতিয়ার করার দূরদর্শী ভাবনা থাকতেই পারে।
জোড়াফুল ছাড়তে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
যদিও দলের ঐতিহাসিক প্রতীক জোড়াফুল অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নে কোনোভাবেই নরম অবস্থান নিতে রাজি নন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৯৭ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় তাঁর নিজের হাতেই ‘ঘাসফুল ও জোড়াফুল’ প্রতীকটি নির্বাচন করা হয়েছিল। দলের জন্মলগ্ন থেকে জড়িয়ে থাকা এই আবেগের প্রতীকটিকে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে যেকোনো মূল্যে নিজের দলের বহাল রাখতে বদ্ধপরিকর তিনি।
কয়েকদিন আগে এই প্রতীক বিতর্ক প্রসঙ্গে জনসমক্ষে নিজের দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে বলেছিলেন,
“আমি জানি ওরা প্রতীক পাবে না। কিন্তু যদি ভ্যানিশ কুমার বাবু আমাদের দল শেষ করার জন্য প্রতীক দিয়েও দেন, তাতেও কিছু যায় আসে না। দরকার হলে আমি গলায় প্রতীক ঝুলিয়ে মানুষের কাছে বেরোব।”
তার এই মন্তব্যে স্পষ্ট যে, আইনি ও রাজনৈতিক ময়দানে শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত তিনি।
আইনি লড়াই বনাম ভবিষ্যতের সমীকরণ
শেষ পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীকটি কোন রাজনৈতিক পক্ষের হাতে থাকবে, তার চূড়ান্ত ফয়সালা অবশ্য নির্ভর করছে আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার পরই। নির্বাচন কমিশন এবং আদালতের দরজায় কড়া নাড়ার পর এই প্রতীকের আইনি মালিকানা কার হাতে যায়, তা সময়ই বলবে। তবে তার বহু আগেই সম্ভাব্য বিকল্প প্রতীক হিসেবে ‘সূর্যমুখী’ নিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে, তা আগামী দিনে বাংলার রাজনীতির সমীকরণকে আরও অনেক বেশি জটিল ও রোমাঞ্চকর করে তুলতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।