বিশ্বকাপ বিক্রির ছক ভেস্তে যাওয়ার পর চরম বিপর্যয়ে ফিফা সভাপতি! ট্রাম্পও ফোন না ধরায় বড় একাকী ইনফান্তিনো

বিশ্ব ফুটবলের মসনদে কি তবে এবার পরিবর্তনের পালা? বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির লোভনীয় ও বিতর্কিত ছক শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ডাস্টবিনে চলে গেল। ইউরোপ ও এশিয়ার শক্তিশালী ফুটবল কর্তাদের তীব্র বিরোধিতার মুখে কার্যত মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো (Gianni Infantino)-র। এই ঘোর বিপদের দিনে যাঁকে অন্ধের যষ্টি বলে সবচেয়ে বেশি ভরসা করেছিলেন, সেই ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-ও নাকি এখন আর তাঁর ফোন ধরছেন না! সব মিলিয়ে ইনফান্তিনোর বর্তমান পরিস্থিতি রীতিমতো সঙিন। যা পরিস্থিতি, তাতে আগামী ২০২৭ সালের নির্বাচনে তিনি যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মসনদে উতরে যাবেন বলে নিশ্চিত ভাবছিলেন, তাতে এখন বড়সড় ধুলো উড়েছে।

ভেস্তে গেল বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মাস্টারপ্ল্যান
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাণিজ্যিক স্বত্ব একটি আলাদা বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী ফন্দি এঁটেছিলেন ইনফান্তিনো। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল, বিশ্বকাপ ও অন্যান্য মেগা টুর্নামেন্টের ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে বেসরকারি লগ্নিকারীদের কাছ থেকে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘরে তোলা। কিন্তু লাভের গুড় পিঁপড়েয় খাওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় উয়েফা (UEFA) এবং এশিয়ার ফুটবল নিয়ামক সংস্থাগুলি। তাদের পরিষ্কার এবং সোজা অভিযোগ ছিল, এত বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের আগে ফিফা তাদের সদস্য দেশগুলির সঙ্গে ন্যূনতম আলোচনাই করেনি।

তীব্র বয়কটের হুমকি ও বিরোধিতার মুখে পড়ে গত শুক্রবার শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে সার্বিয়া, সুইডেন এবং ওয়েলসের মতো দেশ ইতিমধ্যেই তাঁর দিক থেকে নিজেদের সমর্থন পুরোপুরি তুলে নিয়েছে।

ট্রাম্পের ‘নো রিপ্লাই’ ও একাকী ইনফান্তিনো
নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আকস্মিক ভরাডুবির পর রীতিমতো কোণঠাসা ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ফিফা বস। প্রস্তাব বাতিল হওয়ার পর রাজনৈতিক প্রলেপ বা সমর্থনের আশায় তিনি নাকি বারবার ফোন করেছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। কিন্তু ওপার থেকে কোনো সাড়াশব্দ বা উত্তর আসেনি! এককালের রাজনৈতিক বন্ধুর এমন শীতল নীরবতা ও দূরত্ব তৈরি হওয়ায় ইনফান্তিনো এখন নিজেকে একপ্রকার ‘একাকী’ বোধ করছেন। গোটা ফুটবল বিশ্ব যখন তাঁর নীতি ও কার্যকলাপে সমালোচনায় মুখর, তখন এই রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যান তাঁর ক্ষতকে আরও গভীর করেছে।

আসন্ন নির্বাচনে কারা লড়ছেন ফিফার গদির দৌড়ে?
আগামী ২০২৭ থেকে ২০৩১ মেয়াদের জন্য ফিফা সভাপতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আগামী ১৮ মার্চ, যার ভেন্যু মরক্কো। ইনফান্তিনোর গদি টলমল হতে শুরু করায় ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন হেভিওয়েটের নাম জোরেশোরে ভাসতে শুরু করেছে বাজারে:

ভিক্টর মনটাগলিয়ানি: কনকাকাফ-এর প্রধান এবং কানাডার এই অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী ইনফান্তিনোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর কথা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। উয়েফার মতো সরাসরি বয়কটের ডাক না দিলেও, তাঁর সংস্থাও এই শেয়ার বিক্রির প্রস্তাব একবাক্যে খারিজ করে দিয়েছে।

আলেজান্ডার সেফেরিন: উয়েফা বসের সঙ্গে ফিফার সম্পর্ক বরাবরই সাপে-নেউলে। গত মাসে বিশ্বকাপ ফাইনালও তিনি বয়কট করেছিলেন। ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে চলা এই আন্দোলনে তিনিই অন্যতম জোরালো মুখ।

শেখ সলমন বিন ইব্রাহিম আল খলিফা: ফিফা কাউন্সিলের এই সিনিয়র সহ-সভাপতি বিশ্বকাপের কলেবর বাড়িয়ে ৬৪ দল করার কড়া সমালোচক। এএফসির এই কর্তা সরাসরি জানিয়েছেন, ফিফার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যে মারাত্মক গলদ রয়েছে, এই ঘটনা সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

নাসের আল-খেলাইফি: ইউরোপীয় ফুটবল কর্তারা ইতিমধ্যেই কাতারের এই প্রভাবশালী স্পোর্টস এক্সিকিউটিভের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। ফিফার সর্বোচ্চ মসনদে তাঁর বসার সম্ভাবনাও বর্তমানে বেশ উজ্জ্বল বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

লিস ক্লাভেনেস: বিশ্ব ফুটবলে অন্যতম প্রতিবাদী ও লড়াকু মুখ নরওয়ের এই মহিলা কর্তা। ইনফান্তিনোর ‘বিশ্বকাপ বিক্রি’র ছকের বিরুদ্ধে তিনি শুরু থেকেই সবচেয়ে বেশি সুর চড়িয়েছিলেন।

সব মিলিয়ে, সবুজ ঘাসের মাঠ ছাপিয়ে বিশ্ব ফুটবলের অন্দরমহল এখন বলের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতেই বেশি মগ্ন। জিয়ানি ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক বিদায়ঘণ্টা কি সত্যিই বেজে গেল? এই জল্পনার চূড়ান্ত উত্তর দেবে কেবল ভবিষ্যৎই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *