গ্লাসগো জয় করে দেশের মাটিতে ত্রিপুরার ‘সোনার মেয়ে’ অস্মিতা দে! বিমানবন্দরে রাজকীয় অভ্যর্থনা

গ্লাসগোর কমনওয়েলথ গেমসের মহারণ শেষ করে সোমবার রাতেই সগৌরবে দেশের মাটিতে পা রাখলেন চ্যাম্পিয়ন। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তখন যেন এক উৎসবের মেজাজ। রাজকীয় অভ্যর্থনায় বরণ করে নেওয়া হলো জুডোতে দেশের হয়ে ইতিহাস গড়া অস্মিতা দে (Asmita Dey)-কে। তবে গলায় সাফল্যের কোনো অহংকার বা আত্মতুষ্টির লেশমাত্র নেই, বরং তাঁর চোখেমুখে আগামী দিনের সুদূর প্রসারী স্বপ্ন। ত্রিপুরার এই ‘সোনার মেয়ে’র দৃঢ় বিশ্বাস, কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চে জুডোতে ভারতের এই অভাবনীয় সাফল্য দেশের সামগ্রিক ক্রীড়াচিত্রকে চিরতরে বদলে দেবে। এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য— ভারতের বুকে জুডোর ব্যাপক প্রসার ঘটানো এবং নতুন প্রজন্মকে এই খেলার প্রতি আকৃষ্ট করা।

নতুন প্রজন্মের প্রতি অস্মিতার বিশেষ বার্তা
চলতি কমনওয়েলথ গেমসে (CWG 2026) জুডোর মতো কঠিন খেলায় ভারত এক আসরে মোট চারটি পদক জিতেছে, যার মধ্যে রয়েছে ঐতিহাসিক দুটি সোনা। ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে জুডোতে এমন যুগান্তকারী সাফল্য এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এই দলগত সাফল্যই দেশের প্রচলিত ধ্যানধারণা সম্পূর্ণ বদলে দেবে বলে প্রবল আশাবাদী অস্মিতা।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘খুব ভাল লাগছে। এই প্রথমবার জুডোতে ভারত দুটো সোনা, একটা রুপো এবং একটা ব্রোঞ্জ জিতেছে। এটা ভীষণ বড় একটা ব্যাপার। এবার ভারতের মানুষ জুডোকে আরও ভাল করে চিনবে।’ খেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা বিপুল। নতুন প্রজন্মকে ম্যাটে আসার আহ্বান জানিয়ে অস্মিতা আরও যোগ করেন, ‘আমি চাই আরও বাচ্চারা এই খেলায় অংশ নিক। তারা মাঠে নেমে খেলুক।’

অদম্য জেদ ও খাদের কিনারা থেকে বিশ্বজয়
গ্লাসগোর ফাইনালে কানাডার শক্তিশালী প্ৰতিদ্বন্দ্বী হেইডি কোয়াচের বিরুদ্ধে অস্মিতার সেই রূপকথার লড়াই এখন গোটা দেশের চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে। ওই একটা ম্যাচই যেন প্রমাণ করে দিয়েছে ভারতীয় অ্যাথলিটদের আপসহীন মানসিক কাঠিন্য। ফাইনাল ম্যাচে একটা সময় ০-১ ব্যবধানে পিছিয়ে ছিলেন তিনি। এমনকি ভুল করার সুবাদে পেনাল্টিও জুটেছিল কপালে। কিন্তু সেখান থেকেই চরম মানসিক জোর দেখিয়ে দুরন্ত প্রত্যাবর্তন ঘটান ত্রিপুরার এই কন্যা।

ঠিক কীভাবে সম্ভব হলো এই অসম্ভব লড়াই? অস্মিতার উত্তর ছিল একদম সোজাসাপ্টা ও আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। তিনি জানান, ‘আমি মনে মনে স্থির করেছিলাম যে সোনাটাই নেব। সেই জন্যই আমাকে জিততেই হত।’ এই অদম্য জেদ আর জেতার পণই তাঁকে ‘গোল্ডেন স্কোর’ পর্বে নির্ণায়ক পয়েন্ট এনে দেয় এবং নিশ্চিত করে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের ইতিহাসে প্রথম জুডো সোনা (Judo Gold Medal)।

চার পদকে নতুন যুগের সূচনা
অস্মিতার এই স্বপ্ন দেখার নেপথ্যে রয়েছে গোটা ভারতীয় জুডো টিমের যৌথ অবদান। গ্লাসগোর পোডিয়ামে তাঁর সঙ্গে পদক গলায় ঝুলিয়ে উঠেছিলেন আরও তিন ভারতীয় অ্যাথলিট। পুরুষদের বিভাগে সোনা জিতেছেন হর্ষ সিং, রুপোজয়ী হয়েছেন যামিনী মৌর্য এবং উন্নতি শর্মার ঝুলিতে এসেছে ব্রোঞ্জ পদক। সব মিলিয়ে মোট চারটি পদক জয় ভারতের ক্রীড়া ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করেছে।

একসময় যে খেলা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের খুব একটা আগ্রহ, পরিকাঠামো বা উন্মাদনা ছিল না, গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস সেই জুডোকেই দেশের পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এল (Commonwealth Games)। অস্মিতা দে-র এই জোরালো বার্তা এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন আসলে গোটা বিজয়ী দলেরই মনের কথা। আগামী দিনে আরও অনেক শিশু ও তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় জুডোর ম্যাটে নামবেন এবং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখবেন। অস্মিতাদের হাত ধরে ভারতের মাটিতে আজ সত্যি সত্যিই জুডোর এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *