কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন কি অধরা থেকে যাবে? লাফিয়ে বাড়ছে আবাসন বা বাড়ির দাম, বলছে নতুন রিপোর্ট

শহরে নিজের একটি ফ্ল্যাট বা আবাসন কেনার স্বপ্ন কার না থাকে? তবে সাম্প্রতিক এক রিয়েল এস্টেট রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতার আবাসন বাজারে দাম ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী। দেশের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় বৃদ্ধির হার কিছুটা কম হলেও, বাজার এখনও বেশ চড়া। যাঁরা আগামী দিনে কলকাতায় ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এক নজরে রিয়েল এস্টেট রিপোর্টের মূল তথ্য
রিয়েল এস্টেট পরামর্শদাতা সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের আটটি বড় শহরে মোট ১ লক্ষ ৭১ হাজার ৪৭১টি আবাসন বিক্রি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি বাজারে নতুন আবাসন প্রকল্পের সংখ্যাও বেড়েছে। কলকাতার রিয়েল এস্টেট বাজারের ক্ষেত্রে যে তথ্যটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, তা হলো— গত এক বছরে শহরে গড় আবাসনের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
দেশের অন্যান্য মেট্রো শহরের তুলনায় এই হার কম মনে হতে পারে (যেমন দিল্লি-ফরিদাবাদে দাম বৃদ্ধির হার ১৮% এবং বেঙ্গালুরুতে ৯%), তবে এটি স্পষ্ট যে কলকাতার আবাসন বাজারও ক্রমশ চড়া হচ্ছে।
দাম বাড়ার আসল কারণগুলি কী কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাজারে যে নতুন প্রজেক্ট বা আবাসন প্রকল্পগুলি আসছে, তার একটা বড় অংশই তুলনামূলকভাবে প্রিমিয়াম বা বেশি দামের। বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসনের (Affordable Housing) জোগান কমে যাওয়ায় সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের বিকল্পও বেশ সীমিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া লাগাতার জমির মূল্য বৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রী (সিমেন্ট, রড ইত্যাদি) এবং শ্রমিকদের মজুরি বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফ্ল্যাটের দামের উপর।
রিপোর্টে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনেক এলাকায় নতুন ফ্ল্যাটের জোগান বিক্রির তুলনার অনেকটাই বেশি হওয়ায় নির্মাতাদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতাও বেশ বেড়েছে। তাই ক্রেতাদের আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট সংস্থা এখন ফ্লেক্সিবল পেমেন্ট প্ল্যান, সাবভেনশন স্কিম এবং স্ট্যাম্প ডিউটিতে বিশেষ ছাড়ের মতো আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা অফার করছে।
এখন ফ্ল্যাট কেনা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে?
যাঁরা নিজের থাকার জন্য কিনতে চান: যাঁরা নিজের বসবাসের জন্য বাড়ি কিনতে ইচ্ছুক এবং আর্থিকভাবে প্রস্তুত, তাঁদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে দাম কমতে পারে—এই আশায় সিদ্ধান্তের সময় পিছিয়ে দেওয়া সবসময় লাভজনক হয় না। কারণ কলকাতার বাজারে মূল্যবৃদ্ধির গতি পুরোপুরি থামেনি।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে: অন্যদিকে, বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ফ্ল্যাট কিনতে চাইলে শুধু দামের দিকে তাকালে চলবে না। প্রকল্পের লোকেশন বা এলাকা, ভবিষ্যতে সেখানে মেট্রো বা অন্যান্য পরিকাঠামোগত উন্নয়নের সম্ভাবনা, ভাড়ার চাহিদা কেমন এবং নির্মাতার বা বিল্ডারের বিশ্বাসযোগ্যতা কেমন—এই বিষয়গুলি সমানভাবে বিচার করা জরুরি।
দেশের অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় কলকাতার বাজার এখনও অনেকটাই সাশ্রয়ী। এই কারণেই এখানে দাম বাড়লেও তা হঠাৎ করে অস্বাভাবিক জায়গায় পৌঁছায়নি। এখনও বহু ক্রেতা ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে ফ্ল্যাট খুঁজছেন। তবে মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন এলাকা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পেরিফেরাল বা উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলিতে চাহিদা বাড়ার ফলে সেই সমস্ত এলাকায় দাম বাড়ছে দ্রুতগতিতে।
ফ্ল্যাট কেনার আগে যে বিষয়গুলিতে নজর দেওয়া দরকার:
১. প্রকল্পটি RERA-তে সঠিকভাবে নথিভুক্ত (Registered) কি না তা যাচাই করুন।
২. জমির আইনি নথিপত্র এবং খতিয়ান ঠিক আছে কি না তা আইনিভাবে খতিয়ে দেখুন।
৩. নির্মাতার বা ডেভেলপারের আগের কাজ ও ট্র্যাক রেকর্ড কেমন, তা জেনে নিন।
৪. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাটের পজিশন বা দখল হাতে পাওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
৫. বিভিন্ন ব্যাঙ্কের হোম লোনের সুদের হার এবং নির্মাতাদের দেওয়া অফারগুলি তুলনা করে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন।
সব মিলিয়ে, কলকাতার আবাসন বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা বজায় থাকলেও, ক্রেতাদের সুবিধার জন্য নানা অফারও রয়েছে। তাই নিজের বাজেট, ব্যক্তিগত প্রয়োজন এবং আর্থিক সক্ষমতা ভালোভাবে বিচার করেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।