গ্ল্যামারাস জীবন ছেড়ে খাকির অহংকার চূর্ণ! ৩০ হাজার টাকা ঘুষ কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে গেলেন মধ্যপ্রদেশের ‘স্টার ডিএসপি’

মধ্যপ্রদেশ পুলিশ বিভাগে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে কাটনির সিটি সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (সিএসপি) নেহা পচিসিয়া। একসময় এয়ার হোস্টেসের চাকচিক্যময় জীবন ও উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে যিনি খাকি উর্দিকে ভালোবেসেছিলেন, আজ তিনিই ‘অবৈধ চাঁদাবাজি’ এবং ‘কর্তব্যে অবহেলা’র মতো গুরুতর অভিযোগে কাঠগড়ায়। এই চাঞ্চল্যকর মামলার আঁচ কাটনি ছাড়িয়ে সোজা গিয়ে পৌঁছেছে ভোপালের পুলিশ সদর দপ্তরে (পিএইচকিউ)।
৩০ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে ট্রাক আটকের অভিযোগ
ঘটনার সূত্রপাত গত ২১শে জুলাই রাতে। কাটনির পরিবহন ব্যবসায়ী মহেন্দ্র কুমার জৈন জেলা পুলিশ সুপার অভিনয় বিশ্বকর্মার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ, রাতে যানবাহন তল্লাশির সময় তাঁর বালি ও ডলোমাইট বোঝাই একটি ট্রাক থামানো হয়। এরপর গাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার নাম করে সিএসপি নেহা পচিসিয়া ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই নগদ ২৫ হাজার টাকা আদায় করা হয় এবং বাকি ৫ হাজার টাকার জন্য পরের দিন চালককে চাপ দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর দাবি, টাকা দিতে অস্বীকার করায় তাঁর গাড়িটি থানায় আটক করে মিথ্যা মামলা ও আইনি ব্যবস্থার হুমকি দেওয়া হয়।
এসপি-র তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও শাস্তি
অভিযোগ পেয়েই নড়েচড়ে বসে কাটনি জেলা প্রশাসন। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ সুপার অভিনয় বিশ্বকর্মা অবিলম্বে সিএসপির চালক ও কনস্টেবল কেশব সিংকে বরখাস্ত করেন। একই সঙ্গে সিএসপি নেহা পচিসিয়াকে কুথলা, মাধবনগর এবং রঙ্গনাথ নগর—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর পরিবর্তে সেই দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছে আজাক ডিএসপি শিব পাঠকের হাতে।
হত্যা মামলাতেও গাফিলতির অভিযোগ
শুধু চাঁদাবাজির অভিযোগই নয়, নেহা পচিসিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে আরও একটি গুরুতর বিভাগীয় তদন্ত। একটি হত্যা মামলায় নির্দিষ্ট ৯০ দিনের মধ্যে আদালতে চার্জশিট জমা না দেওয়ায় মূল অভিযুক্ত জামিন পেয়ে যায়। এমনকি ওই মামলাকে প্রভাবিত করার জন্য অভিযুক্তের জমি কম দামে বিক্রয় করানোর মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
নিরপেক্ষ তদন্তের ভার জবলপুরের আইপিএসের কাঁধে
মামলার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াটি কাটনি জেলা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পরিবহন ব্যবসায়ীর অভিযোগ এবং বিভাগীয় অবহেলার দুটি মামলাই এখন তদন্ত করছেন জবলপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তথা মহিলা আইপিএস অফিসার অনু বেনিওয়াল। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষ হওয়ার পরই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে; আপাতত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাচোর থেকে খাকির উর্দি: রূপকথার মতো ছিল নেহার জার্নি
রাজগড় জেলার পাচোর তহসিলের এক সাধারণ স্কুল শিক্ষকের কন্যা নেহা পচিসিয়ার পুলিশ অফিসার হয়ে ওঠার গল্পটি ছিল সিনেমাকেও হার মানানোর মতো। দ্বাদশ শ্রেণির পর এভিয়েশন কোর্স সম্পন্ন করে তিনি এয়ার ইন্ডিয়ায় এয়ার হোস্টেসের গ্ল্যামারাস চাকরি পান। কিন্তু কর্পোরেট জীবনের চাকচিক্য তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী তৃপ্তি দিতে পারেনি।
চাকরি ছেড়ে সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতি শুরু করেন নেহা। ২০১২ থেকে টানা চার বছর কঠোর পরিশ্রমের পর ২০১৬ সালের এমপিএসসি (MPSC) পরীক্ষায় ২০তম স্থান অর্জন করে ডিএসপি পদ বেছে নেন তিনি। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় তাঁর অসামান্য প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসেবামূলক কাজ দেখে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান স্বয়ং তাঁকে সম্মানিত করেছিলেন। সেই আইডল পুলিশ কর্মকর্তা আজ দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ায় হতবাক গোটা রাজ্য পুলিশ মহল।