মেয়ের পড়াশোনার খরচ তুলতে হবে! ৪০ লাখ যৌতুক ও বেতনের টাকার লোভে কলেজে ঢুকে অধ্যাপক মেয়েকে কুপাল বাবা

সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করে গড়ে তোলা, তাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে নিজের পায়ে দাঁড় করানোই যেকোনো বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ও গর্ব। কিন্তু কর্নাটকের বেঙ্গালুরু থেকে যে নৃশংস ও মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এসেছে, তা সমাজের সমস্ত পিতৃত্বের ধারণাকেই যেন এক লহমায় ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। যৌতুকের লোভ এবং মেয়ের বেতনের টাকা আত্মসাৎ করার পারিবারিক বিবাদের জেরে, খোদ বাবার হাতেই প্রাণঘাতী হামলার শিকার হলেন এক শিক্ষিতা তরুণী। কলেজের ভেতরে ঢুকে পেশায় সহকারী অধ্যাপক নিজের মেয়েকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুনের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠল এক বাবার বিরুদ্ধে। গত ২৫ জুলাই ঘটে যাওয়া এই পৈশাচিক কাণ্ডে দেশজুড়ে চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন?
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্ত ওই তরুণীর নাম লক্ষ্মী দুর্গা। তিনি বেঙ্গালুরুর একটি নামী বেসরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপিকা হিসেবে কর্মরত। অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম নাগেন্দ্র, যিনি পেশায় একজন ক্যাব চালক এবং লক্ষ্মী দুর্গার নিজের বাবা।
গত ২৫ জুলাই বিকেল তিনটে নাগাদ আচমকাই বেঙ্গালুরুর ওই কলেজে গিয়ে হাজির হন নাগেন্দ্র। তিনি কলেজের কর্মীদের জানান যে মেয়ের সঙ্গে তাঁর কিছু জরুরি কথা রয়েছে। বাবা পরিচয় দেওয়ায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সোজা ডিপার্টমেন্টের প্রধানের (HOD) ঘরে নিয়ে যান, যেখানে সেই মুহূর্তে লক্ষ্মী দুর্গা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বাবা ও মেয়ের মধ্যে তীব্র বচসা শুরু হয়। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নাগেন্দ্র তাঁর সঙ্গে নিয়ে আসা একটি ধারাল ছুরি বের করে আচমকা মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। পেটে, বুকে ও ঘাড়ে একের পর এক উপর্যুপরি কোপ মেরে মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে ফেলে রেখে দ্রুত চম্পট দেন অভিযুক্ত। বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওই অধ্যাপিকা।
হামলার নেপথ্যে ছিল কোন লোমহর্ষক কারণ?
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ পারিবারিক অশান্তির চিত্র। দীর্ঘদিন ধরেই বাবা নাগেন্দ্রর সীমাহীন লোভ ও অন্যায্য দাবির শিকার হচ্ছিলেন লক্ষ্মী দুর্গা:
৪০ লক্ষ টাকার যৌতুক দাবি: কিছুদিন আগেই মেয়ের বিয়ের জন্য একটি পাত্রপক্ষের সঙ্গে আলোচনা পাকা করেছিলেন নাগেন্দ্র। কিন্তু বিয়ের কথা এগোতেই তিনি পাত্রপক্ষের কাছে সাফ ৪০ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবি করে বসেন! নাগেন্দ্রর অদ্ভুত ও নির্মম যুক্তি ছিল—মেয়েকে এত কষ্ট করে পড়াশোনা শিখিয়ে আজকের এই উচ্চপদে বসাতে তাঁর প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে, তাই বিয়ের আগেই সেই সমস্ত টাকা তাঁকে ক্যাশ বা যৌতুক হিসেবে ফেরত দিতে হবে।
বেতন কেড়ে নেওয়ার জেদ: শুধু যৌতুকই নয়, অধ্যাপিকা মেয়ের পুরো মাসের পরিশ্রমের কষ্টার্জিত বেতন প্রতি মাসে তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নাগেন্দ্র প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করতেন।
বাবার এই অন্যায়, লোভী ও অদ্ভুত দাবিগুলোর জোরালো প্রতিবাদ করেছিলেন লক্ষ্মী দুর্গা এবং তাঁর মা। আর সেই কারণে গত কয়েকমাস ধরে তাঁদের পরিবারে প্রায় প্রতিদিনই চরম অশান্তি লেগেই থাকত। শেষ পর্যন্ত মেয়ের ওপর এই অবাধ্যতার রাগ থেকেই বাবা এমন পৈশাচিক ও নৃশংস পদক্ষেপ করতে পারেন বলে অনুমান তদন্তকারীদের। ঘটনার পরই পুলিশ অভিযুক্ত ক্যাবচালক নাগেন্দ্রকে দ্রুত গ্রেফতার করেছে এবং পুরো ঘটনার পেছনের অন্য কোনো মোটিভ বা যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।