টেলিকম দুনিয়ায় বিরাট বিপ্লব! দেশের প্রথম টেলিকম ম্যানুফ্যাকচারিং জোন গড়ে উঠছে গোয়ালিয়রে

টেলিকম ও প্রযুক্তি জগতে এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের পথে পা বাড়াল ভারত। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এবং মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ড. মোহন যাদবের যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রথম ‘টেলিকম ম্যানুফ্যাকচারিং জোন’ (Telecom Manufacturing Zone বা TMZ) গড়ে উঠতে চলেছে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র শহরে। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগে তৈরি হতে যাওয়া এই হাই-টেক জোনে ১৪ হাজারেরও বেশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

নতুন এই প্রকল্পের জন্য সম্প্রতি নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে এক জমকালো অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সরকারের টেলিকমিউনিকেশন বিভাগ (DoT) এবং মধ্যপ্রদেশ সরকারের শিল্পনীতি ও বিনিয়োগ উন্নয়ন দফতরের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়নমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া এবং মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব।

‘আত্মনির্ভর ভারত’ গড়ার পথে বড় মাইলফলক:
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বলেন, “গোয়ালিয়রে গড়ে ওঠা এই প্রকল্প মধ্যপ্রদেশ তথা সমগ্র দেশের জন্য এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এই টেলিকম ম্যানুফ্যাকচারিং জোন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘আত্মনির্ভর ভারত’, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ এবং ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর স্বপ্নপূরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর মাধ্যমে ভারতকে বিশ্বমানের টেলিকম উৎপাদন হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।”

জানা গিয়েছে, প্রায় ৩৫০ একর জমির ওপর সম্পূর্ণ অত্যাধুনিক ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ (Plug and Play) মডেলে এই টেলিকম ম্যানুফ্যাকচারিং জোনটি তৈরি করা হবে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে মূল পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্র সরকারের টেলিকমিউনিকেশন দফতরের পক্ষ থেকে ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

একই ছাদের নিচে গবেষণা থেকে উৎপাদন:
এই নতুন শিল্পাঞ্চলে মোবাইল ফোন, উন্নত নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম, ফাইবার অপটিক্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ৫জি ও ৬জি প্রযুক্তির গবেষণা (R&D), নকশা তৈরি, টেস্টিং এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য বিশ্বমানের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে। অর্থাৎ, গবেষণা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত উৎপাদন পর্যন্ত টেলিকম শিল্পের একটি সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম একই ছাদের নিচে পাওয়া যাবে।

৩৫ হাজার কোটির বিনিয়োগ ও ১৪ হাজার চাকরি:
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিপুল বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর জেরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, যার ফলে বিশেষভাবে উপকৃত হবেন গোয়ালিয়র-চম্বল অঞ্চলের তরুণ প্রজন্ম ও যুবসমাজ।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ডিক্সন টেকনোলজিস (Dixon Technologies), এইচএফসিএল (HFCL) এবং তেজস নেটওয়ার্কস (Tejas Networks)-এর মতো দেশের প্রথম সারির হেভিওয়েট সংস্থাগুলি এই প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর জেরে গোয়ালিয়র অদূর ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম প্রধান হাই-টেক উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

বিশেষ পরিচালন ব্যবস্থা ও অংশীদারি:
এই মেগা প্রকল্পটি স্বচ্ছ ও সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য একটি ‘স্পেশাল পারপাস ভেহিকল’ (SPV) বা বিশেষ সংস্থা গঠন করা হবে। এই সংস্থায় মধ্যপ্রদেশ সরকারের অংশীদারি থাকবে ৫১ শতাংশ এবং কেন্দ্রীয় টেলিযোগাযোগ দফতরের অংশীদারি থাকবে ৪৯ শতাংশ। এই বিশেষ সংস্থাই সার্বিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সামলাবে।

পরিশেষে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া জানান, কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই টেলিকম ম্যানুফ্যাকচারিং জোন কেবল একটি সাধারণ শিল্প প্রকল্প নয়, বরং এটি ভারতের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যতের শক্ত ভিত। ‘সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা’ (Cooperative Federalism)-র এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এই প্রকল্প মধ্যপ্রদেশকে দেশের ইলেকট্রনিক্স ও টেলিকম উৎপাদনের মানচিত্রে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *