আমফানের ত্রাণে কোটি টাকার নয়ছয়! CAG- এর বিস্ফোরক রিপোর্টে কি ফাঁস হল বড় দুর্নীতি?

২০২০ সালের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আমফানের (Amphan) ত্রাণ বিতরণ ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আসছিল বিরোধী শিবির। আর এবার সেই সমস্ত অভিযোগকেই এক প্রকার সত্য প্রমাণ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনল কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই বিষয়ে বিস্তারিত বিস্ফোরক রিপোর্ট তুলে ধরেন প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল (অডিট-২) মনীশ কুমার।

ক্যাগের অডিটে কী কী অনিয়ম ধরা পড়েছে?

মনীশ কুমারের দাবি অনুযায়ী, আমফানের ত্রাণ বণ্টনের তদন্ত করতে গিয়ে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি নজরে এসেছে অডিটরদের। যার মধ্যে প্রধান ত্রুটিগুলি হল:

  • ক্ষয়ক্ষতির অতিরঞ্জিত চিত্র: অডিটে দেখা গিয়েছে, বহু ক্ষেত্রেই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার আসল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল।

  • একই ব্যক্তির একাধিকবার নাম: ত্রাণ পাওয়ার জন্য তৈরি তালিকায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ছিল। তদন্তে দেখা গিয়েছে, একই ব্যক্তির নাম বা অ্যাকাউন্ট নম্বর বারবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

  • সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন: ত্রাণের টাকা বিলি করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়ম এবং একাধিক সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের ঘটনা সামনে এসেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ক্যাগের ৬টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ

ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্নীতি না হয়, তার জন্য রাজ্য সরকারকে মোট ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে ক্যাগ:

১. ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নে স্বচ্ছতা: দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন ও রিপোর্ট তৈরির পদ্ধতি আরও শক্তিশালী এবং নির্ভুল করতে হবে, যাতে সঠিক প্ল্যানিং করা সম্ভব হয়। ২. মানসম্মত অ্যাপ্লিকেশন ফরম্যাট: ত্রাণ সহায়তার জন্য একটি নির্দিষ্ট ও নিয়মতান্ত্রিক অ্যাপ্লিকেশন ফরম্যাট তৈরি করা আবশ্যক। ৩. স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া: কারা প্রকৃত ত্রাণ পাবেন, সেই প্রাপক বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল করতে হবে। ৪. বাধ্যতামূলক নথি যাচাই: ত্রাণের টাকা বা সহায়তা হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারা সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করতে হবে। ৫. নজরদারি বৃদ্ধি: ত্রাণসামগ্রী মজুত করা এবং তা উপভোক্তাদের মধ্যে বিলি করার পুরো প্রক্রিয়ার উপর নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। ৬. তদন্ত ও অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট (ATR): পুরো প্রক্রিয়ায় ঘটে যাওয়া অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তার একটি ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’ ক্যাগের কাছে জমা দিতে হবে।

শুধু কথায় বিশ্বাস নয়, সরেজমিনে হবে তদন্ত!

সরকার ত্রাণ বিলির ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করলেও তা সহজে মেনে নিতে নারাজ ক্যাগ। মনীশ কুমার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার মুখে বললেই ক্যাগ তা বিশ্বাস করবে না। ক্যাগের প্রতিনিধিরা সরাসরি সরেজমিনে গিয়ে খতিয়ে দেখবেন যে সুপারিশগুলি বাস্তবে কতটা কার্যকর করা হয়েছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসন ঠিক কী পদক্ষেপ নিয়েছে।

আমফান ঝড়ের সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট

  • আঘাত হানার তারিখ: ২০২০ সালের ২০শে মে।

  • গতিবেগ: ঘণ্টায় ১৫৫ থেকে ১৮৫ কিলোমিটার।

  • ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল: বকখালি ও সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী এলাকা।

সেই সময়েই ত্রাণ বন্টনে ব্যাপক রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, যোগ্যদের বঞ্চিত করা এবং শাসকদলের ঘনিষ্ঠদের ত্রাণ চুরির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। ক্যাগ রিপোর্টের পর সেই বিতর্ক ফের নতুন করে জোরালো হলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *