WBIDC-র মেগা দুর্নীতি ফাঁস! ফ্লিপকার্টকে জমি বরাদ্দ করতেই ১২ কোটিরও বেশি লোকসান, বিস্ফোরক CAG রিপোর্ট

পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পর রাজ্যের শিল্পায়ন ও আর্থিক পরিকাঠামো নিয়ে একের পর এক অস্বস্তিকর তথ্য সামনে আসছে। এবার কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (WBIDC)-এর বিপুল পরিমাণ লোকসান ও দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ্যে এল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই লোকসানের মোট পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা (সঠিক হিসেবে ১২ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা)। আর সবচেয়ে বড় অভিযোগ, এই আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে চেপে গিয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকার।

হরিণঘাটায় ফ্লিপকার্ট (ইনস্টাকার্ট)-এর জমি বরাদ্দ বিতর্ক

নদিয়ার হরিণঘাটায় অবস্থিত শিল্পতালুকেই রয়েছে ই-কমার্স জায়ান্ট ফ্লিপকার্টের লজিস্টিক্স শাখা ‘ইনস্টাকার্ট সার্ভিসেস’-এর দেশের বৃহত্তম ফুলফিলমেন্ট সেন্টার। ২০২২ সালে এই অত্যাধুনিক কেন্দ্রের উদ্বোধন হয়, যা রাজ্যে ফ্লিপকার্টের বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু এই জমি বরাদ্দের নেপথ্যেই বড়সড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে ক্যাগ।

  • জমির প্রাথমিক পরিকল্পনা: ২০১৭ সালের অগাস্টে রাজ্য সরকার হরিণঘাটায় ১,৩২৬.৯৩ একর জমিতে তিনটি পর্যায়ে শিল্প পার্ক গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

  • জমি অধিগ্রহণ: ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ভূমি দফতরকে ২০৬ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা দিয়ে ৩৫৮.১৯ একর জমি অধিগ্রহণ করে WBIDC। এরপর ‘যেমন আছে, যেখানে আছে’ ভিত্তিতে একর প্রতি ৬৩ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা বেস প্রাইস নির্ধারণ করে আগ্রহপত্র (EoI) জারি করা হয়।

  • ফ্লিপকার্টের প্রবেশ: ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ইনস্টাকার্ট সার্ভিসেস ৯৯১ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে ১০৭.৩৫ একর জমি চায়। পরবর্তীতে ২০২০ সালে অতিরিক্ত ১.৭৭ একর সহ মোট ১০৯.১২ একর জমি ৯৯ বছরের লিজের জন্য বরাদ্দ করা হয়।

কেন এবং কীভাবে হল ১২ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকার লোকসান?

ক্যাগের রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল বা কারচুপি করা হয়েছে: ১. জলাশয়ের হিসেব নয়: ক্যাগের অডিটে ধরা পড়েছে, হরিণঘাট industriales পার্কের লেআউট প্ল্যান অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় ৫৫.৮৯ একর জলাশয় রয়েছে, যা আদতে শিল্পায়নের কাজে কোনোভাবেই ব্যবহারযোগ্য নয়। ২. ভুল বেস প্রাইস নির্ধারণ: শিল্পের জন্য প্রকৃতপক্ষে ব্যবহারযোগ্য জমি ছিল ৩০২.২৯৯ একর। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগম জমির মূল্য নির্ধারণের সময় ওই জলাশয়ের অংশটিকেও যুক্ত করে মোট ৩৫৮.১৯ একর জমিকে হিসাবের ভিত্তি ধরে। ৩. আর্থিক ঘাটতি: ক্যাগ জানাচ্ছে, ব্যবহারযোগ্য জমি অনুযায়ী পুনরায় হিসাব করলে সঠিক বেস প্রাইস হওয়া উচিত ছিল একর প্রতি ৭৫ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা। সেই হিসেবে ১০৯.১২ একর জমির জন্য ইনস্টাকার্টের কাছ থেকে ৮২ কোটি ৯ লক্ষ টাকা লিজ প্রিমিয়াম আদায় করার কথা ছিল। কিন্তু WBIDCL আদায় করেছে মাত্র ৬৯ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা। এর ফলেই ১২ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকার সরাসরি আর্থিক লোকসান হয়েছে।

সরকারের সাফাই

এদিকে ২০২৩ সালের মে মাসে রাজ্য সরকারের তরফে ক্যাগ-কে জানানো হয়েছিল যে, ২০১৮ সালের জুলাই মাসে WBIDC-র পরিচালন পর্ষদ (বোর্ড) বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমেই একর প্রতি ৬৩ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা বেসপ্রাইস অনুমোদন করেছিল। এমনকি সেই একই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই জমি বরাদ্দের প্রস্তাব রাজ্য মন্ত্রিসভাও পাশ করেছিল। তবে ক্যাগের এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পর রাজ্য শিল্পোন্নয়ন নিগমের জমি নীতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *