স্থায়ী পদের প্রায় ৪০ শতাংশই খালি! দেশজুড়ে পরীক্ষা নেওয়া এনটিএ-র অন্দরের হাল নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলি পরিচালনা করে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা NTA। অথচ সেই সংস্থার অন্দরেই কর্মী সংকটের ছবিটা কতটা ভয়াবহ, তা উঠে এল সংসদের ফ্লোরে। রাজ্যসভায় একটি প্রশ্নের লিখিত জবাবে কেন্দ্র জানিয়েছে, এনটিএ-তে অনুমোদিত ৩৯টি স্থায়ী পদের মধ্যে ১৫টি পদই সম্পূর্ণ খালি রয়েছে। বর্তমানে সংস্থায় স্থায়ী কর্মী বলতে মাত্র ২৪ জন কর্মরত রয়েছেন।
স্থায়ী পদের কী অবস্থা? সংসদে জানাল মন্ত্রক
গত ২২ জুলাই রাজ্যসভায় এক লিখিত জবাবে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ড. সুকান্ত মজুমদার জানান যে, এনটিএ মূলত স্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক এবং আউটসোর্সড—এই তিন স্তরের কর্মীদের মাধ্যমে তাদের সমস্ত কাজকর্ম পরিচালনা করে থাকে।
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:
এনটিএ-তে মোট স্থায়ী পদ রয়েছে ৩৯টি, যার সবকটিই ডেপুটেশনের মাধ্যমে পূরণ করার নিয়ম।
এর মধ্যে বর্তমানে মাত্র ২৪ জন কর্মী কাজ করছেন এবং ১৫টি পদ ফাঁকা পড়ে আছে।
সংস্থাকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে অতিরিক্ত ১৬টি পদ তৈরি করা হয়েছে (যার মধ্যে ৮টি অধিকর্তা বা ডিরেক্টর স্তরে এবং ৮টি যুগ্ম অধিকর্তা স্তরে)। এই নতুন পদগুলি ‘সেন্ট্রাল স্টাফিং স্কিম’-এর আওতায় পূরণ করা হবে।
বর্তমানে স্থায়ী কর্মীদের তালিকায় রয়েছেন একজন ডিরেক্টর জেনারেল, দু’জন যুগ্ম সচিব, একজন লেভেল-১৪ ডিরেক্টর, সাতজন লেভেল-১৩ ডিরেক্টর, ছ’জন যুগ্ম অধিকর্তা, তিনজন উপ-অধিকর্তা, দু’জন সহকারী অধিকর্তা এবং দু’জন সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট।
চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সড কর্মীর ওপর ভরসা
স্থায়ী কর্মীর অভাব মেটাতে চুক্তি ও বাইরের সংস্থার ওপর নির্ভর করতে হয় এনটিএ-কে।
সংস্থায় বর্তমানে ৭৩ জন চুক্তিভিত্তিক কর্মী কাজ করছেন। যার মধ্যে রয়েছেন একজন জেনারেল ম্যানেজার, ১ জন সিনিয়র উপদেষ্টা, ৩ জন উপদেষ্টা, ৫ জন সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ৪৪ জন কনসালট্যান্ট, একজন সিনিয়র সফটওয়্যার ডেভেলপার, একজন অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ১৭ জন ‘ইয়াং প্রফেশনাল’।
পাশাপাশি, ডেটা অ্যানালিস্ট, কনসালট্যান্ট, লিগ্যাল অ্যাসোসিয়েট এবং হাউসকিপিংয়ের মতো বিভিন্ন পদে ১২৪ জন কর্মীকে আউটসোর্স বা চুক্তির মাধ্যমে বাইরের এজেন্সি থেকে নিয়োগ করা হয়েছে।
এছাড়া পরীক্ষার মরশুমে প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুল সংখ্যক নীচুতলার কর্মী (পর্যবেক্ষক, সিটি কো-অর্ডিনেটর, কেন্দ্র তত্ত্বাবধায়ক এবং বিভিন্ন সমন্বয় কমিটির সদস্য) নিয়োগ করা হয়।
২০১৮ সাল থেকে এনটিএ-র কাজের পরিসংখ্যান
রাজ্যসভার সদস্য ড. ভি. শিবদাসনের এক প্রশ্নের জবাবে গত পাঁচ বছরের কর্মী নিয়োগ, পরীক্ষা আয়োজন ও আর্থিক হিসাবের সমস্ত তথ্য পেশ করেছে কেন্দ্র।
পরীক্ষা আয়োজন: ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এনটিএ এখনও পর্যন্ত ২৭০টিরও বেশি পরীক্ষা সফলভাবে আয়োজন করেছে, যেখানে মোট ৬.৬ কোটিরও বেশি পরীক্ষার্থী নাম নথিভুক্ত করেছেন।
চলতি বছর: ২০২৬ সালে এনটিএ এ পর্যন্ত মোট ১২টি পরীক্ষা পরিচালনা করেছে, যাতে ৬৫ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নেন। বিশেষ করে, বহুচর্চিত ‘নিট-ইউজি ২০২৬’ পরীক্ষাটি গত ৩ মে ৫৬৫টি শহরের ৫,৪৩২টি কেন্দ্রে ১৩টি ভাষায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২১ জুন পুনরায় পরীক্ষা নিয়ে গত ১৬ জুলাই তার ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
এনটিএ-র রমরমিয়ে বাড়া আর্থিক আয়
কর্মী সংকট ও বিভিন্ন বিতর্কের মাঝেও এনটিএ-র আর্থিক ক্ষমতা ও লেনদেন গত কয়েক বছরে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থার আয়-ব্যয়ের হিসাব বলছে:
২০১৯-২০ অর্থবর্ষ: আয় প্রায় ৫০৪ কোটি টাকা ও ব্যয় প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা।
২০২০-২১ অর্থবর্ষ: আয় প্রায় ৫১৫ কোটি টাকা ও ব্যয় প্রায় ৪৩৬ কোটি টাকা।
২০২১-২২ অর্থবর্ষ: আয় প্রায় ৫০৮ কোটি টাকা ও ব্যয় প্রায় ৪২৭ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবর্ষ: আয় একলাফে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০১ কোটি টাকা এবং ব্যয় হয় প্রায় ৬৮২ কোটি টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ: এই বছরে সংস্থার আয় আরও বেড়ে রেকর্ড গড়ে প্রায় ১,১১৭ কোটি টাকায় পৌঁছায় এবং ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১,০৪১ কোটি টাকায়।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির মতো গুরুতর ঘটনার জেরে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে এনটিএ। এই সংস্থাকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার দাবিতে একাধিক মামলা ও আবেদন বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন রয়েছে। এই আবহে সংস্থার অন্দরে স্থায়ী পদের বিরাট শূন্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।