১০০ টাকায় উদ্ধার মাত্র সাড়ে ৪ টাকা! মোদী জমানার ব্যাঙ্ক জালিয়াতি নিয়ে সংসদে বিস্ফোরক তৃণমূল সাংসদ সাগরিকা ঘোষ

শুরু হয়েছে সংসদের বাদল অধিবেশন। আর অধিবেশনের শুরুতেই মোদী সরকারের আমলের আর্থিক দুর্নীতি ও ব্যাঙ্ক জালিয়াতির পরিসংখ্যান তুলে ধরে কেন্দ্রকে চরম আক্রমণ শানালেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষ। সংসদীয় পরিসংখ্যানে চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরে তিনি দাবি করেছেন যে, মোদী সরকারের আমলে বিগত পাঁচ বছরে দেশে ব্যাঙ্ক জালিয়াতির মোট পরিমাণ পৌঁছে গেছে প্রায় ১.৪২ লক্ষ কোটি টাকায়।
কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমজনতার কষ্টার্জিত টাকা?
সংসদে দাঁড়িয়ে সাগরিকা ঘোষ প্রশ্ন তোলেন, গত পাঁচ বছরে ১.৪২ লক্ষ কোটি টাকার জালিয়াতি হলেও তার মধ্যে মাত্র ৬,৩৮৯ কোটি টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। শতাংশের হিসেবে যা মোট জালিয়াতির মাত্র ৪.৫ শতাংশ! অর্থাৎ, প্রতি একশো টাকার মধ্যে প্রায় ৯৫ টাকাই আজও অন্ধকারে হারিয়ে গেছে।
এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের কথা প্রতিধ্বনিত করে তিনি বলেন, এত বিশাল অঙ্কের টাকা ঠিক কোথায় গেল এবং এই জালিয়াতির নেপথ্যেই বা কারা রয়েছে? সরকারের তরফে যতই কঠোর পদক্ষেপের দাবি করা হোক না কেন, বাস্তবে উদ্ধারের হার কেন এত কম এবং বড় নামগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি কেন দেখা যায় না—সেই প্রশ্নও জোরালোভাবে তুলেছেন তিনি।
সাধারণ ঋণগ্রহীতা বনাম বড় কর্পোরেট: দ্বৈত নীতির অভিযোগ
সংসদে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করে তৃণমূল সাংসদ এক তীব্র বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন:
সাধারণ মানুষের ওপর কড়া নজর: যখন দেশের কোনো সাধারণ কৃষক বা ছোট ব্যবসায়ী সামান্য কোনো ব্যাঙ্ক ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হন, তখন ব্যাঙ্কের পক্ষ থেকে তৎক্ষণাৎ কড়া নোটিশ পাঠানো হয়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দেওয়া হয় এবং সিভিল বা ক্রেডিট স্কোর নষ্ট করে দেওয়া হয়।
বড় খেলাপির ক্ষেত্রে ধীর গতি: কিন্তু যখন হাজার হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি হয়, তখন সেই একই ব্যবস্থা অত্যন্ত শ্লথ গতিতে চলে। ফাইল বছরের পর বছর এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ঘুরতে থাকে এবং টাকা উদ্ধারের গতি হয়ে পড়ে শামুকের মতো। কে এই ‘ভিআইপি’ জালিয়াতদের রক্ষা করছে?—এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃত করে সাগরিকা ঘোষ জানান, ব্যাঙ্ক জালিয়াতি কেবল কিছু সরকারি টাকার লোকসান নয়, এটি গোটা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় বিপদ। যে পরিমাণ টাকা উদ্ধার হয় না, সেই অর্থ দিয়ে নতুন করে ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয় না। এর ফলে দেশের অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ড—যেমন কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং এমএসএমই (MSME) সেক্টরগুলিতে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছরে পিএনবি (PNB), স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI), কানাড়া ব্যাঙ্কের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে বড় বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। নীরব মোদী, মেহুল চোকসি, ভূষণ স্টিল বা এসএস গ্রুপের মতো বহু কেলেঙ্কারির অভিযুক্তরা দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও উদ্ধারের প্রক্রিয়া দীর্ঘ আইনি জটিলতায় আটকে রয়েছে। এদিকে সাধারণ ঋণগ্রহীতারা নন-পারফর্মিং অ্যাসেট (NPA) বা খেলাপি ঋণের চাপে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। বাদল অধিবেশনের শুরুতেই এই বিস্ফোরক পরিসংখ্যান ও তথ্য পেশ করায় জাতীয় রাজনীতিতে এখন তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে।