“এসপি-আইসি-রা বিজেপির জেলা সভাপতি!” শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকে বিস্ফোরক আক্রমণে ফুঁসছেন মমতা

ক্ষমতা হারানোর পর প্রথম একুশে জুলাইয়ে বিরোধী শিবিরে বসেই বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আন্দোলনের দামামা বাজালেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শহিদ দিবসের মঞ্চ থেকে সভা ভণ্ডুলের চেষ্টা, দলীয় কর্মীদের উপর হামলা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং দলত্যাগী নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্যে শাসকশিবিরকে তুলোধনা করেন তিনি। একই সঙ্গে কর্মীদের চাঙ্গা করতে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, “আমরা ইঁদুরের মতো বালিশের খোলে লুকিয়ে থাকি না, সুন্দরবনের বাঘের বাচ্চার মতো লড়াই করি।” আর এই লড়াইকে চূড়ান্ত রূপ দিতেই এদিন নবান্ন, রাইটার্স এবং লালবাজার অভিযানের কড়া হুঙ্কার দিয়েছেন তিনি।

মঞ্চের আগেই তাণ্ডব, বিস্ফোরক অভিযোগ মমতার

এদিন বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে সভার শুরুতেই আগের রাতের ঘটনা নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন মমতা। তাঁর দাবি, পরিকল্পিতভাবে সভা পণ্ড করার চেষ্টা করা হয়েছিল। নেত্রীর ক্ষোভ, “রাত ১০টায় স্টেজ ভেঙে দেওয়া হয়েছে, সাউন্ড সিস্টেমের তার কেটে দেওয়া হয়েছে। ৬০০ জনের বাইক বাহিনী এনে সব তছনছ করার চেষ্টা হয়েছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, মালদা থেকে আসা কয়েকজন কর্মীকে মারধর করা হয়েছে এবং সাউন্ড সিস্টেম বসানোর কর্মীদের উপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এমনকি তাঁর বাড়ির সামনেও বিক্ষোভ দেখানো হয়েছিল বলে জানান তিনি। তবে সমস্ত বাধাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মমতার হুঙ্কার, “ওরা ভেবেছিল আমাকে আটকাবে। আমাকে আটকাতে গেলে প্ল্যান-এ নয়, প্ল্যান-বি, প্ল্যান-সি, প্ল্যান-ডি—সবই তৈরি থাকে।”

প্রশাসন ও দলবদল নিয়ে কঠোর বার্তা

রাজ্যের প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে মমতা বলেন, “এসপি-রা বিজেপির জেলা সভাপতি হয়ে গিয়েছেন, আইসি-রা ব্লক সভাপতি হয়ে গিয়েছেন।” কটাক্ষ করে তিনি বলেন, রাজ্যে এখন ‘লবডঙ্কার সরকার’ চলছে।

নির্বাচনের পর তৃণমূলের ২২ জন কর্মী খুন হয়েছেন এবং হাজার হাজার নেতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্পষ্ট জানান, ভয় দেখানোর জন্য এসব করা হলেও সত্যের সামনে কোনও মামলাই টিকবে না। এছাড়া, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভয়ে যাঁরা দল ছেড়েছেন, তাঁদের উদ্দেশে মমতার সাফ বার্তা—যাঁরা নিজেদের বাঁচাতে পালিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের দলে আর কোনও প্রয়োজন নেই।

নবান্ন অভিযানের ডাক ও ‘খেলা হবে’ স্লোগান

আন্দোলনের পথে গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, “সারা পশ্চিমবঙ্গকে জেল ঘোষণা করে দিলেও ভয় নেই। জেলে গেলে কর্মীরাই মালা পরিয়ে সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে আনবে।”

বক্তৃতির শেষে আগামী দিনের আন্দোলনের রূপরেখা স্পষ্ট করে ‘খেলা হবে’ স্লোগান তুলে তিনি ঘোষণা করেন, “এবার ব্যাট-বলের খেলা হবে।” এরপরই বিজেপি সরকারকে সরাসরি সতর্ক করে তিনি বলেন, “এরপর যদি আবার এদিক-ওদিক করার চেষ্টা হয়, তা হলে নবান্ন অভিযান হবে, রাইটার্স অভিযান হবে, লালবাজার অভিযান হবে।”

রাজনৈতিক মহলের মতে, ক্ষমতা হারানোর পর এই একুশে জুলাই নিছকই শহিদ স্মরণ নয়, বরং বিরোধী রাজনীতিতে টিকে থাকতে তৃণমূলের নতুন রাজনৈতিক রণকৌশলের বড় ঘোষণা। সাংগঠনিক ভাঙন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করে রাস্তায় নেমে লড়াইয়ের বার্তা দেওয়াই ছিল এদিনের সভার মূল লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *