“মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকার প্রয়োজন মনে করেনি কমিশন!” একুশের ঐতিহাসিক রিপোর্ট পেশ করে তীব্র আক্রমণ মুখ্যমন্ত্রীর!

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ও মর্মান্তিক রক্তক্ষয়ী ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিধানসভার অন্দরে তীব্র রাজনৈতিক ঝড় তুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিন বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারকে নজিরবিহীন ভাষায় আক্রমণ করেন তিনি। সেদিনের সেই কালো অধ্যায়ের তদন্তে গঠিত কমিশনের রিপোর্টের একাধিক চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলি হাউসের সামনে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে, সুদীর্ঘ কাল ধরে বঞ্চিত থাকা সেদিনের আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন তিনি।
পুলিশের ভূমিকা ও নথিপত্র লোপাট নিয়ে কমিশনের পর্যবেক্ষণ
তৎকালীন স্বরাষ্ট্র (রাজনৈতিক) দফতরের বিজ্ঞপ্তি এবং তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই ঘটনায় কমিশন মোট ৪৪ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে তলব করেছিল। সেই তালিকায় ছিলেন প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, তৎকালীন হোম সেক্রেটারি মণীশ গুপ্ত এবং তৎকালীন পুলিশ কমিশনার তুষার কান্তি তালুকদার। অথচ, যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা দল নিজেদের সেদিনের আন্দোলনের সর্বেসর্বা বলে দাবি করে, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কমিশন সাক্ষী হিসেবে ডাকার কোনো প্রয়োজনই মনে করেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কমিশনের মূল পর্যবেক্ষণগুলি বিধানসভায় পাঠ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান:
সেদিনের ঘটনার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো যথাযথ বা নিরপেক্ষ নির্বাহী তদন্ত হয়নি। পুরো প্রক্রিয়াটিই অসৎ উদ্দেশ্যে ও সরল বিশ্বাসে করা হয়নি।
তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের দেওয়া রিপোর্ট এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের বিবৃতির মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্য ও ফারাক ছিল। কমিশনার নিজে প্রকৃত সত্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছিলেন।
রাইটার্স বিল্ডিং থেকে বহু দূরে মেট্রো সিনেমার সামনে যে পুলিশি গুলিব চালানো হয়েছিল, তার প্রতিটিই ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, উস্কানিবিহীন এবং অযৌক্তিক।
বিধানসভায় প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, “তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কেন তথ্য আড়াল করতে চাইলেন? কারণ তাঁর পাওয়ার মিনিস্টার ফেসে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল।”
নথিপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাম আমলের চরম উদাসীনতাকে কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাইটার্স বিল্ডিং ও লালবাজারের মতো অতি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে কীভাবে সরকারি নথিপত্র এবং ফাইল গায়েব হয়ে গেল, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত। অতীতে যারা নথিপত্র সংরক্ষণের বিষয়ে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছিল, আজ তারাই বড় বড় ভাষণ দিচ্ছে বলে বাম শিবিরকে তীব্র তোপ দাগেন তিনি।
ক্ষতিপূরণ নিয়ে অতীতের বঞ্চনা ও বর্তমান সরকারের বড় ঘোষণা
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ১৯৯৩ সালের ঘটনায় নিহত ও আহতদের যে অত্যন্ত নগণ্য আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছিল, তার তীব্র সমালোচনা করে কমিশন যে সুপারিশ করেছিল তা পুনরায় হাউসে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। কমিশন অতীতে নিহত ১২ জনের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তৎকালীন সরকার সেই সুপারিশ ধামাচাপা দিয়ে নিহতদের মাত্র ২ লক্ষ এবং আহতদের মাত্র ১৫,০০০ টাকা ধরিয়ে দিয়েছিল।
আন্দোলনে সর্বস্ব হারানো ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলির প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী আবেগঘন সুরে বলেন, “আপনাদের আবেগ ও সংগ্রামকে ব্যবহার করে অনেকে সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁরা হেলিকপ্টারে চড়ে ঘুরেছেন, দুবাই-সিঙ্গাপুর-আমেরিকায় গিয়ে নিজেদের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু আপনারা বঞ্চিতই থেকে গেছেন। আপনারা যদি বর্তমান সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন জানান, তবে সেই সুযোগ আপনাদের দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেই ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আপনাদের হাতে তুলে দেব।”