প্রয়াত হংকং সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা প্যাট্রিক সে! ৮৯ বছর বয়সে চিরবিদায় নিলেন ‘ব্রাদার ফোর’

দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে হংকং তথা এশীয় চলচ্চিত্র জগৎ দাপিয়ে বেড়ানো প্রবীণ অভিনেতা প্যাট্রিক সে ইয়িন (Patrick Tse) আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর অবশেষে আর শেষরক্ষা হলো না; এক বর্ণময় ও অসাধারণ কর্মজীবনের অবসান ঘটিয়ে চিরতরে না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন এই আইকনিক তারকা। তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিয় অভিনেতার প্রয়াণের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি।
পরিবারের শ্রদ্ধাঞ্জলি ও শেষ জীবন
প্রয়াত অভিনেতার কন্যা জেনিফার সে এবং পুত্র নিকোলাস সে এক যৌথ বার্তায় তাঁদের বাবার বর্ণময় জীবন, কীর্তি এবং বিনোদন জগতের প্রতি তাঁর আজীবন অনুরাগ সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেছেন। অভিনেতা ও শিল্পীর পাশাপাশি একজন প্রাণবন্ত মানুষ হিসেবে তিনি কীভাবে চারপাশের মানুষের জীবনে আনন্দ ছড়িয়ে দিতেন, সে কথাও তুলে ধরেন তাঁরা।
চলচ্চিত্র অনুরাগীদের কাছে যিনি অত্যন্ত আদরের সঙ্গে ‘ব্রাদার ফোর’ বা ক্যান্টনিজ ভাষায় ‘সেই গোর’ নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি শেষ বয়সেও ভক্তদের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই হংকংয়ের ‘দ্য পিক’-এ ভক্তরা তাঁকে হুইলচেয়ারে বসা অবস্থায় দেখতে পান। গায়ে লাল ট্র্যাকস্যুট, মাথায় টুপি এবং তাঁর ট্রেডমার্ক সানগ্লাস পরিহিত অবস্থায় কিছুটা রোগা লাগলেও, তিনি অত্যন্ত হাসিমুখে ভক্তদের সঙ্গে ছবি তোলার আবদার রক্ষা করেছিলেন।
হংকং সিনেমায় রূপকথার মতো উত্থান
হংকং ফিল্ম আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালে একটি ফিল্ম কোম্পানির প্রশিক্ষণ কোর্সে প্রত্যাখ্যাত হলেও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব পুন বিং-কুয়েনের নজরে পড়েন প্যাট্রিক সে। এরপর পুন-এর দিহুয়া ফিল্ম কোম্পানিতে যোগ দিয়ে ১৯৫৪ সালে ‘সেভ ইয়োর ওয়াটার সাপ্লাই’ ছবির মাধ্যমে রূপোলি পর্দায় তাঁর দুর্দান্ত অভিষেক ঘটে। কেরিয়ারের শুরু থেকেই কমেডি, ড্রামা থেকে শুরু করে অ্যাকশনধর্মী ছবি—সবক্ষেত্রেই একজন মার্জিত এবং স্টাইলিশ নায়ক হিসেবে তিনি জয় করেছিলেন দর্শকদের মন। তাঁর অভিনীত একাধিক ছবি হংকংয়ের সিনেমা জগতে ক্লাসিকের মর্যাদা পেয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬৭ সালের ‘স্টোরি অফ এ ডিসচার্জড প্রিজনার’ ছবিটি অন্যতম, যা পরবর্তীতে আশির দশকে পরিচালক জন উ ‘এ বেটার টুমরো’ নামে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন।
সাত দশকের এই সুদীর্ঘ কেরিয়ারে ১০০টিরও বেশি চলচ্চিত্র এবং জনপ্রিয় টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন প্যাট্রিক সে। সত্তরের দশকে তিনি ছোটপর্দায় পা রাখেন এবং টিভিবি-র (TVB) আমন্ত্রণে ‘সোর্ডসম্যান সিউ সাপ ইয়াত লং’ নামক জনপ্রিয় কুংফু নাটকে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেন। পরবর্তীতে জুয়া-ভিত্তিক কালজয়ী নাটক ‘দ্য শেল গেম’ এবং এটিভি (ATV)-র জনপ্রিয় সিরিজ ‘সেন্ট্রাল অ্যাফেয়ার্স’-এ তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে গেঁথে রয়েছে। উল্লেখ্য, পরিবারের চতুর্থ সন্তান হওয়ার সুবাদে এবং ‘দ্য শেল গেম’ নাটকে ল সেই-হোই চরিত্রটির সুবাদে সহকর্মীরা তাঁকে ভালোবেসে ‘ব্রাদার ফোর’ ডাকতেন, যা পরবর্তীতে তাঁর নামের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়।
পুরস্কার এবং শেষ মুহূর্তের স্বীকৃতি
আশির দশকের শেষের দিকে তিনি কিছুকালের জন্য কানাডায় চলে গেলেও, ২০০০-এর দশকের শুরুতে ফের হংকং ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সসম্মানে কামব্যাক করেন। বিশ্বখ্যাত পরিচালক স্টিফেন চাও-এর ব্লকবাস্টার ছবি ‘শাওলিন সকার’-সহ বেশ কিছু স্মরণীয় চলচ্চিত্রে তাঁকে দেখা যায়।
চলচ্চিত্র জগতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে ৩৮তম হংকং ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ আজীবন সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এরপর ২০২২ সালে বার্ষিক এই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ‘টাইম’ নামক ব্ল্যাক কমেডি চলচ্চিত্রে একজন অবসরপ্রাপ্ত ভাড়াটে খুনির চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের সুবাদে তিনি সেরা অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করেন। উল্লেখ্য, কেরিয়ারের শুরুতেও তিনি সেরা অভিনেতার পুরস্কারের সর্বকনিষ্ঠ বিজয়ী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে হংকং তথা এশিয়ার বিনোদন জগতে এক অপূরণীয় ও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।