কেন রেলস্টেশন-পার্ক ছেড়ে কোথাও যায় না পায়রা? গবেষণায় মিলল ৩,৫০০ বছরের চমকপ্রদ তথ্য

রাস্তায় বেরোলেই চোখে পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পায়রা। রেলস্টেশনের ছাদ, পার্কের বেঞ্চ কিংবা পুরনো দালানের কার্নিশ—কোথায় নেই এরা? আধুনিক নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই পাখিদের আমরা হয়তো ‘শহুরে উপদ্রব’ হিসেবেই দেখি। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, পায়রাদের সঙ্গে মানুষের এই সহাবস্থানের ইতিহাস আজকের নয়, প্রায় ৩,৫০০ বছরের পুরনো!
পাহাড় ছেড়ে কেন শহরে?
বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে আমরা যে ‘রক পিজন’ বা শহুরে পায়রা দেখি, তাদের আদি নিবাস ছিল দুর্গম পাহাড়ি ও পাথুরে এলাকা। তবে প্রাচীন সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যখন বড় বড় দুর্গ ও অট্টালিকা তৈরি শুরু করল, তখন সেই ভবনগুলোই পায়রাদের কাছে পাহাড়ের খাঁজের মতোই নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠল। ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের শহরগুলোতে তাদের নিয়মিত যাতায়াত ও বসবাসের প্রমাণ মিলেছে।
বার্তাবাহক থেকে খাদ্যের উৎস
প্রাচীনকালে পায়রা কেবল একটি পাখি ছিল না, ছিল মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আদান-প্রদানে ‘হোমিং পিজন’ বা বার্তাবাহক পায়রা ছিল ভরসা। যুদ্ধের ময়দান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও এদের ছিল বিশেষ গুরুত্ব।
কেন শহর পায়রাদের স্বর্গরাজ্য?
গবেষকদের মতে, শহুরে পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে এই পাখিদের। এর পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ রয়েছে:
প্রাকৃতিক পাহাড়ের বিকল্প: উঁচু দালান, সেতু এবং রেলস্টেশনগুলোকে পায়রা প্রাকৃতিক পাথুরে খাঁজ হিসেবে ব্যবহার করে।
খাবারের সহজলভ্যতা: মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার ও শস্য শহরকে তাদের জন্য একটি আদর্শ আবাসস্থলে পরিণত করেছে।
সহাবস্থান নাকি সমস্যা?
শহরে পায়রার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু নেতিবাচক দিকও সামনে আসছে। পুরনো ভবনের ক্ষতি, মলমূত্রের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে অনেক শহরই এখন নিষ্ঠুর পদ্ধতি বাদ দিয়ে মানবিক উপায়ে এদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজছে।
উপসংহার
বিজ্ঞানীদের মতে, পায়রাকে কেবল সাধারণ পাখি হিসেবে দেখাটা ভুল। মানুষের ইতিহাস এবং নগর সভ্যতার বিকাশের নীরব সাক্ষী এই পাখিরা। পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে পায়রা যে সফল উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, তা জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য অধ্যায়। প্রতিদিন চোখের সামনে উড়ে বেড়ানো এই পাখির মধ্যেই যে হাজার বছরের এক অদ্ভুত ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা এই গবেষণা নতুন করে আমাদের মনে করিয়ে দিল।