ভারত খেলছে না, তবুও ফুটবলে বুঁদ দেশ! বিশ্বকাপ নিয়ে কেন বাড়ছে এই উন্মাদনা?

ভারতের জাতীয় দল ফিফা বিশ্বকাপে নেই, তাতে কী? ভারতীয়দের ফুটবল উন্মাদনায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। বরং ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ ভারতীয়দের কাছে যেন ক্রিকেটের পাশাপাশি দ্বিতীয় ‘ধর্ম’। অফিসের ক্যাফেটেরিয়া থেকে হোস্টেলের কমন রুম—সবখানেই এখন ফুটবলের চর্চা। কেন জাতীয় দলের অনুপস্থিতিতেও ভারত এভাবে ফুটবলের নেশায় মগ্ন? এর নেপথ্যে রয়েছে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ফুটবলের ‘গ্লোবাল এন্টারটেইনমেন্ট’ চরিত্র।

কেন ভারতীয়দের কাছে বিশ্বকাপ এক আবেগ?
ভারতীয় ফুটবল প্রেমীদের কাছে কোনো নির্দিষ্ট দেশের জাতীয় দলের হয়ে সমর্থন করা অনেকটা আইপিএল-এর ফ্র্যাঞ্চাইজি অনুসরণ করার মতোই আবেগের। ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা প্রিমিয়ার লিগের সৌজন্যে তরুণ প্রজন্মের কাছে ফুটবলাররা এখন সুপারস্টার। মেসি, রোনাল্ডো, এমবাপ্পে বা ইয়ামাল—এঁদের জনপ্রিয়তা কোনো দেশের সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নেই। ফলে ভারতের জাতীয় দলের অনুপস্থিতি এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না।

সোশ্যাল মিডিয়া: গেম চেঞ্জার
এইবারের বিশ্বকাপের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা। ৯০ মিনিট ম্যাচ দেখার ধৈর্য না থাকলেও, ইনস্টাগ্রাম রিলসের কল্যাণে গোল, সেলিব্রেশন, ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণ বা মজার সব মিম মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে যাচ্ছে স্মার্টফোনে। এআই-জেনারেটেড ফুটবল কন্টেন্ট থেকে শুরু করে সেলিব্রিটিদের ওয়াচ-পার্টি—সব মিলিয়ে ফুটবল এখন এক ‘স্ন্যাকবল এন্টারটেইনমেন্ট’।

সহজলভ্য স্ট্রিমিং ও ফরম্যাট
এবার ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপের পরিধি অনেক বেড়েছে। মোট ১০৪টি ম্যাচের ফলে প্রতিদিন কোনো না কোনো নাটকীয় গল্প বা অঘটন ঘটে চলেছে, যা দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখছে। তার ওপর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ম্যাচ দেখার সহজলভ্যতা স্মার্টফোন ব্যবহারকারী তরুণ প্রজন্মের জন্য এই টুর্নামেন্টকে আরও হাতের নাগালে নিয়ে এসেছে। সময়ের পার্থক্য (Time difference) সত্ত্বেও গভীর রাত পর্যন্ত ম্যাচ দেখা বা পরের দিন সকালে হাইলাইটস দেখা এখন এক নতুন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

মেসি-রোনাল্ডোর লড়াই আজও সেরা বিতর্ক
ভারতীয়দের কাছে এখনও ফুটবলের প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘মেসি বনাম রোনাল্ডো’ বিতর্ক। মেসি যেখানে খেতাব ধরে রাখার লড়াইয়ে নেমেছেন, সেখানে রোনাল্ডোর এটি শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। এছাড়া নতুন তারকা জুড বেলিংহাম বা লামিন ইয়ামালের উত্থান তরুণ প্রজন্মকে ফুটবলের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট করেছে।

ফুটবল: শুধু খেলা নয়, এখন বিনোদন
ফিফা বিশ্বকাপ এখন কেবল মাঠে সীমাবদ্ধ নেই। ফাইনালের হাফটাইম শো-তে বিটিএস (BTS)-এর মতো শিল্পীদের অংশগ্রহণ বা টুর্নামেন্টের সাথে জুড়ে যাওয়া ফ্যাশন ও মিউজিক কালচার বিশ্বকাপকে একটি গ্লোবাল এন্টারটেইনমেন্ট উৎসবে পরিণত করেছে।

ক্রিকেট ভারতের প্রধান খেলা হলেও, গত এক দশকে ফুটবল যে দ্রুত হারে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তা অনস্বীকার্য। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, গোয়া বা উত্তর-পূর্ব ভারতের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সংস্কৃতির বাইরেও আজ আইএএসএল (ISL) ও প্রিমিয়ার লিগ ভারতের মূলস্রোতের ক্রীড়াজগতে ফুটবলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ভারতীয় ফুটবল দল একদিন বিশ্বকাপে খেলবে—সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে, আপাতত ফুটবলীয় এই উৎসব উপভোগ করাই এখন ভারতবাসীর লক্ষ্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *