টানা ২০ দিন অনাহার! সোনম ওয়াংচুকের শরীরে নীরবে ঘটছে কোন ভয়ঙ্কর পরিবর্তন? চাঞ্চল্যকর তথ্য চিকিৎসকের!

লাদাখের জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন আজ, ১৭ জুলাই (২০২৬) ২০তম দিনে পদার্পণ করল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অনাহারের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানুষের শরীর অল্প সময়ের জন্য খাদ্য ছাড়া মানিয়ে নিতে পারলেও, দীর্ঘস্থায়ী অনাহার শরীরের অভ্যন্তরীণ বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় (Metabolic changes) এমন কিছু মারাত্মক পরিবর্তন আনে, যা শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে বিকল করে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকলে প্রথম দিন থেকে শরীরের ভেতরে কী কী ঘটে, কীভাবে চর্বি ও পেশি গলে শক্তি তৈরি হয় এবং কেন হার্ট ও ব্রেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে— তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন বেঙ্গালুরুর স্পার্স (SPARSH) হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন কনসালট্যান্ট ডক্টর এম জে জয়কান্ত।
প্রথম দিন থেকে আমৃত্যু: শরীরের ভেতরের যুদ্ধ
ডক্টর জয়কান্ত জানান, অনশনের প্রথম দিন থেকেই শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা কমতে শুরু করে। ফলে লিভার তার সঞ্চিত গ্লাইকোজেন ছেড়ে দেয় এবং নতুন গ্লুকোজ তৈরি করার সংকেত পায়। সাধারণত এক দিনের মধ্যেই লিভারের গ্লাইকোজেন ফুরিয়ে যায়। এরপর শরীর শক্তির জন্য চর্বি ভাঙতে শুরু করে এবং লিভার ফ্যাটি অ্যাসিডকে ‘কিটোন’-এ রূপান্তর করে, যা ব্রেনকে সচল রাখে।
কিন্তু অনশন দীর্ঘায়িত হলে শরীর তার চর্বি, পেশি এবং কাঠামোগত প্রোটিনও ভাঙতে শুরু করে। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা মারাত্মক কমে যায় (Hypoglycaemia)। ধীরে ধীরে মাথা ঘোরা এবং চিন্তাভাবনা ধীর হওয়া থেকে শুরু করে বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হওয়া, খিঁচুনি, কোমা এবং শেষ পর্যন্ত অঙ্গ বিকল হয়ে মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে হার্ট ও ব্রেন
চিকিৎসকের মতে, অনাহারে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঙ্গ প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন নয়, তবে হৃদযন্ত্র বা হার্ট এক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ হার্ট নিজেই একটি পেশি। দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকলে হার্টের পেশির ভর কমে যায় এবং এর রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া শরীরে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফেটের মাত্রা কমে যাওয়ায় হার্টের বৈদ্যুতিক সঞ্চালন ব্যাহত হয়, যা বিপজ্জনক কার্ডিয়াক অ্যারিথমিয়া (হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা) তৈরি করতে পারে। রক্তচাপ কমে যাওয়ার কারণে ব্রেনে রক্তপ্রবাহ কমে যায়, যার ফলে স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতি হতে পারে।
ক্ষুধা কেন ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যায়?
শরীর যতই দুর্বল হোক না কেন, অনশনের একপর্যায়ে ক্ষুধা পাওয়ার অনুভূতি কমে যায়। ডক্টর জয়কান্ত এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “অনশনের সময় শরীরে ‘কিটোসিস’ (Ketosis) তৈরি হলে এবং মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামিক অ্যাপেটাইট পাথওয়েতে পরিবর্তন আসার কারণে ক্ষুধার অনুভূতি মরে যায়। তবে ক্ষুধা না লাগার মানে এই নয় যে শরীর সুরক্ষিত আছে। এটি আসলে হরমোনের একটি জটিল অভিযোজন মাত্র। ভেতরে ভেতরে মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি চলতেই থাকে।”
শুধু নুন-জল কি কোনো সুরক্ষা দেয়?
অনেকে ভাবেন অনশনের সময় নুন-জল খেলে হয়তো শরীর বাঁচে। চিকিৎসক স্পষ্ট জানিয়েছেন, জল শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে এবং নুন সাময়িকভাবে রক্তের পরিমাণ বজায় রাখতে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু নুন-জলে কোনো ক্যালোরি, প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ফ্যাট বা ভিটামিন থাকে না। এটি পেশিক্ষয়, গ্লুকোজের ঘাটতি বা ভিটামিনের অভাব রোধ করতে পারে না। উল্টো অতিরিক্ত নুন খেলে হার্ট ও কিডনির ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
অনশন ভাঙার সময় চরম সতর্কতা জরুরি: ওত পেতে থাকে মৃত্যু!
দীর্ঘদিন অনশনে থাকার পর হঠাৎ করে পেট পুরে বা বেশি কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘রিফিডিং সিন্ড্রোম’ (Refeeding Syndrome) নামে পরিচিত। হঠাৎ খাবার খেলে শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়, যা ফসফেট, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামকে আচমকা কোষের ভেতরে ঠেলে দেয়। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে হার্ট ফেইলিওর, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, কোমা এমনকি তৎক্ষণাৎ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
তাই দীর্ঘ অনাহারের পর রোগীকে খাবার খাওয়াতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের কড়া তত্ত্বাবধানে, অত্যন্ত ধীরে ধীরে এবং থায়ামিন ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রেখে পুষ্টি সরবরাহ শুরু করতে হয়। সোনম ওয়াংচুকের বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা তাঁর স্বাস্থ্যের ওপর কড়া নজরদারি রাখছেন।