দারিদ্র্যের বলি আফগান কিশোরীরা! ঋণ শোধ করতে বাবা-ই দিচ্ছেন বিয়ে, বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক মাতৃত্বের হার

তালিবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে আফগানিস্তানের অবস্থা এখন তলানিতে। ক্ষুধা, চরম দারিদ্র্য এবং মেয়েদের শিক্ষার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার জেরে দেশটিতে বাল্যবিবাহ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় গর্ভধারণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘জান টাইমস’ এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক ভয়াবহ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আফগান কিশোরীদের সেই বিষাদময় জীবনের ছবি।

ঋণ শোধের ‘পণ্য’ যখন সন্তান:
আফগানিস্তানের বহু পরিবার এখন আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে। সংসার চালাতে বা মহাজনের ঋণ শোধ করতে বাবা-মায়েরা তাঁদের নাবালিকা কন্যাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে শিশু অবস্থাতেই ভবিষ্যতের বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তিবদ্ধ করা হচ্ছে পরিবারগুলোকে। শিক্ষার পথ বন্ধ হওয়ার পর এই মেয়েদের কাছে সংসারই হয়ে উঠছে একমাত্র ‘ঠিকানা’।

সিমার জীবনই এক জ্বলন্ত উদাহরণ:
প্রতিবেদনে সিমা (নাম পরিবর্তিত) নামে এক কিশোরীর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবার চাপে পড়ে চাচাতো ভাইকে বিয়ে করতে বাধ্য হন তিনি। আজ ১৮ বছর বয়সে এসে সিমা চার সন্তানের মা। এর মধ্যে এক সন্তান মারা গেছে এবং অন্যটি সদ্যোজাত। সিমা জানান, তালিবান যখন ক্ষমতায় আসে, তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিলেন। কিন্তু স্কুল বন্ধ হতেই বাবার চাপ ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়ে তাঁকে বিয়ে করতে হয়। নিজের করুণ অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে সিমা বলেন, “আমার কিডনি ও মাথাব্যথায় সব সময় শরীর ভেঙে আসে। মাত্র ১৮ বছরেই নিজেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধার মতো মনে হয়।”

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা:
হাসপাতালগুলোতে কিশোরী মায়েদের ভিড় বাড়ছে। উত্তর আফগানিস্তানের একটি সরকারি হাসপাতালের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই সেখানে ১৮ বছরের কম বয়সী ৪২ জন কিশোরী সন্তানের জন্ম দিয়েছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এই কিশোরীরা এক্টোপিক প্রেগন্যান্সি এবং প্রসবকালীন জটিলতায় ভুগছে। অপুষ্টি ও অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ফলে ইতোমধ্যেই দুই কিশোরী মায়ের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।

অমানবিক বাস্তব:
আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির শিকার হাজার হাজার সিমা। স্কুলে যাওয়ার বদলে তারা এখন গবাদি পশু পালন, জল আনা এবং ঘরোয়া কাজের যাতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। মানবিক সহায়তার পথ রুদ্ধ হওয়া এবং অর্থনৈতিক ধসের ফলে এই কিশোরীদের শৈশব যেন এক চিরস্থায়ী অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তবে তালিবান সরকারের অমানবিক বিধি-নিষেধের মাঝে এই চিত্র পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *