আলমারিতে রাখা প্রিয় বইগুলো নীরবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে না তো? বর্ষায় ছত্রাক থেকে বাঁচাতে আজই করুন এই কাজ

বই শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, অনেকের কাছে এটি এক বুক স্মৃতি, আবেগ আর ভালোবাসার এক অনন্য সংগ্রহশালা। প্রিয় কোনো উপন্যাস, বিরল কোনো সংস্করণ কিংবা পড়াশোনার অতি প্রয়োজনীয় বই—সবকিছুরই প্রয়োজন বাড়তি যত্নের। বিশেষ করে বর্ষাকালে বা আর্দ্র আবহাওয়ায় বই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে।
বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পের কারণে বইয়ের পাতা নরম হয়ে যায়, মলাট বেঁকে যায় এবং সবচেয়ে বড় শত্রু ‘ছত্রাক’ বা ফাঙ্গাসের জন্ম হয়। একবার বইয়ে ছত্রাক ধরে গেলে শুধু তার সৌন্দর্যই নষ্ট হয় না, তা থেকে ঘরে শ্বাসকষ্ট বা অ্যালার্জির মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে সামান্য কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তুললেই বছরের পর বছর আপনার প্রিয় বইগুলোকে রাখা যায় একদম নতুনের মতো।
চলুন জেনে নেওয়া যাক আর্দ্র আবহাওয়ায় বই সুরক্ষিত রাখার কিছু জাদুকরী টিপস:
১. দেয়াল থেকে দূরে, বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে রাখুন
বইয়ের তাক বা বুকশেলফ রাখার জন্য ঘরের এমন কোণ বেছে নিন যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পাওয়া যায়। বুকশেলফটি দেয়ালের সঙ্গে একেবারে ঠেকিয়ে না রেখে অন্তত কয়েক ইঞ্চি ফাঁকা রাখুন। এতে দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে ভাব সরাসরি বইয়ে ছড়াতে পারবে না।
২. প্লাস্টিকে মোড়ার ভুল ভুলেও নয়!
অনেকেই বই ভালো রাখতে প্লাস্টিক কভার দিয়ে মুড়ে রাখেন। কিন্তু আর্দ্র আবহাওয়ায় এটি উল্টো হিতে বিপরীত হতে পারে। প্লাস্টিকের ভেতরে বাতাস চলাচল করতে না পেরে আর্দ্রতা আটকে যায় এবং দ্রুত ছত্রাক জন্মায়। প্লাস্টিকের বদলে কাগজের কভার ব্যবহার করুন, যা কাগজের আর্দ্রতা শুষে নিতে সাহায্য করে।
৩. বুকশেলফ রাখুন ঝকঝকে পরিষ্কার
ধুলাবালি এবং আর্দ্রতা একসঙ্গে মিশলে ছত্রাক ও পোকা-মাকড় দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। তাই নিয়মিত শুকনো সুতি কাপড় দিয়ে বুকশেলফ পরিষ্কার করুন। মাসে অন্তত একবার সব বই বের করে তাকগুলো ভালো করে মুছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
৪. মাঝে মাঝে পাতা উল্টে বাতাস দিন
দিনের পর দিন আলমারিতে বন্দি থাকা বইয়ের পাতায় আর্দ্রতা জমে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই মাঝেমধ্যে বইগুলো বের করে কয়েক মিনিট পাতা উল্টে দেখুন। এতে পাতার ফাঁকে ফাঁকে বাতাস প্রবেশ করবে এবং আর্দ্রতা কেটে যাবে।
৫. ভেজা হাত ও কাপ-পিরিচ থেকে সাবধান
সামান্য ভেজা হাতে বই ধরলে পাতায় দাগ পড়ে যায় এবং কাগজ নরম হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। তাই বই পড়ার আগে হাত ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। এছাড়া বইয়ের ওপর চায়ের কাপ, জলের বোতল বা ভেজা কোনো জিনিস রাখার অভ্যাস আজই বর্জন করুন।
৬. জাদুকরী সিলিকা জেলের ব্যবহার
বইয়ের তাকে বা আলমারির কোণায় ছোট ছোট সিলিকা জেলের (Silica Gel) প্যাকেট রেখে দিন। এগুলো বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা নিমেষেই শুষে নেয়। তবে নির্দিষ্ট সময় পর পর এই প্যাকেটগুলো পরিবর্তন করতে ভুলবেন না।
৭. রোদে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা
বইয়ে স্যাঁতসেঁতে ভাব এলে অনেকেই কড়া রোদে বই মেলে দেন। এতে কিন্তু বইয়ের পাতা হলদেটে হয়ে যায় এবং মলাটের রং চটে যায়। কড়া রোদে না দিয়ে, ঘরের ছায়াযুক্ত কিন্তু বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় বইগুলো খোলা অবস্থায় কিছুক্ষণ রেখে শুকিয়ে নিন।
তাক থেকে অতিরিক্ত গাদাগাদি এড়ান
বুকশেলফে বই অতিরিক্ত ঠেসে রাখলে বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বইগুলো এমনভাবে সাজিয়ে রাখুন যাতে একটির সঙ্গে অন্যটি লেগে থাকলেও চারপাশে সামান্য বাতাস চলাচলের জায়গা থাকে এবং সহজে বের করা যায়।
ছত্রাক দেখা দিলে কী করবেন?
যদি কোনো বইয়ে সাদা, কালো বা সবুজ রঙের ছত্রাকের দাগ দেখতে পান, তবে অবিলম্বে সেটি অন্য বই থেকে আলাদা করুন। এরপর শুকনো স্থানে নিয়ে নরম ব্রাশ দিয়ে আলতো করে ছত্রাকগুলো ঝেড়ে ফেলুন। সংক্রমণ বেশি হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন, কারণ একটি আক্রান্ত বই পুরো বুকশেলফের সব বই নষ্ট করে দিতে পারে।
ডিজিটাল ব্যাকআপ রাখুন
আপনার পড়াশোনা বা গবেষণার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দুষ্প্রাপ্য বইগুলোর প্রয়োজনীয় অংশ বা নোটগুলো ছবি তুলে বা স্ক্যান করে ডিজিটাল ড্রাইভের মাধ্যমে ব্যাকআপ রেখে দিন। এতে কোনো কারণে বই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আপনার মূল্যবান তথ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে না।