“স্বেচ্ছায় কেউ যৌনকর্মী হলে পুলিশ হেনস্থা করতে পারবে না”-জানিয়ে দিলো সুপ্রিমকোর্ট

যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করা কোনো অপরাধ নয়—দীর্ঘদিনের আইনি অস্পষ্টতা দূর করে এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় যৌন পেশায় যুক্ত থাকেন, তবে পুলিশি অভিযানে তাঁকে হেনস্থা বা আটক করা যাবে না।
কী জানাল শীর্ষ আদালত? যৌনপাচারের শিকার হওয়া মহিলাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে আদালত জানায়, ‘স্বেচ্ছায় যৌনবৃত্তি’ এবং ‘মানবপাচারের শিকার’ হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর পার্থক্য রয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে:
-
অপরাধ নয়: প্রাপ্তবয়স্ক কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় জীবিকার তাগিদে যৌনকর্মী হন, তবে তা আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ নয়।
-
পুলিশি হেনস্থা নিষিদ্ধ: পুলিশি অভিযানের সময় যৌনকর্মীদের অযথা আটক করা বা হেনস্থা করা যাবে না।
-
সম্মতির গুরুত্ব: আদালত জানিয়েছে, পুনর্বাসন একটি সাংবিধানিক অধিকার হলেও তা কারও ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কোনো যৌনকর্মী যদি পুনর্বাসন কেন্দ্রে (হোমে) যেতে না চান, তবে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে পাঠানো যাবে না।
আইনি কাঠামোর সংস্কারের ইঙ্গিত ইমমোরাল ট্র্যাফিক (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট বা ITPA-এর ১৭ নম্বর ধারার প্রয়োগ নিয়ে আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিচারপতিদের মতে, অনেক সময় পাচারের শিকার ভুক্তভোগী এবং স্বেচ্ছায় কর্মরতদের একই চোখে দেখা হয়, যা বাস্তবসম্মত নয়। আদালত জোর দিয়ে বলেছে, পুলিশ পুনর্বাসন বা হোমে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিজে থেকে নিতে পারে না; এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্পষ্ট সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক।
রাষ্ট্রের ভূমিকা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা সুপ্রিম কোর্টের এই রায় ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো যৌনকর্মীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করা, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা কাম্য নয়।
এই রায়ের ফলে ভারতের কয়েক লক্ষ যৌনকর্মী আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি তাঁদের সাংবিধানিক মর্যাদার ক্ষেত্রে এক বড় স্বস্তি পেলেন বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা। আদালতের এই বার্তা স্পষ্ট—আইন প্রয়োগের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও মর্যাদাকে সম্মান জানানোই হওয়া উচিত বিচারব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।