মাত্র ৫ দিনে ২৩০ পয়সা হাওয়া! হু হু করে কমছে টাকার দাম, আপনার পকেটে এর কী প্রভাব পড়বে জানুন

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার বড়সড় ধাক্কা লাগল ভারতীয় মুদ্রায়। মার্কিন ডলারের বিপরীতে সর্বকালের রেকর্ড তলানিতে গিয়ে ঠেকল ভারতীয় টাকার (INR) দাম। শুক্রবার লেনদেন চলাকালীন এক সময় ডলারের বিপরীতে টাকার দাম ৯৬-এর গণ্ডিও পার করে গিয়েছিল। যদিও দিনের শেষে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার (RBI) সম্ভাব্য হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামান্য নিয়ন্ত্রণে আসে, তবুও তা এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে সর্বনিম্ন স্তরে বন্ধ হয়েছে। মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে ভারতীয় টাকার এই রেকর্ড পতন সাধারণ মানুষকে তো বটেই, কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদেরও।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, কারেন্সি মার্কেটের এই নজিরবিহীন পতনের নেপথ্যে আসল কারণ কী এবং আগামী দিনে টাকা কি সত্যিই ১০০-র ঘর ছুঁয়ে ফেলবে?

৫ দিনে ২৩০ পয়সার ধাক্কা, লাইফ টাইম লো-তে টাকা
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে অর্থাৎ ৮ মে ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকা বেশ মজবুত অবস্থায় ৯৩.৫১ স্তরে বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে চিত্রটা পুরোপুরি বদলে যায়। প্রতি দিনই একটু একটু করে পড়তে থাকে টাকার দাম। আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় বাজারে শুক্রবার টাকা ৯৫.৮৬-এ খোলার পর লেনদেন চলাকালীন এক সময় ৯৬.১৪-এর রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যায়। যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৫০ পয়সা কম।

অবশেষে দিনের শেষে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ১৭ পয়সা হারিয়ে ৯৫.৮১ স্তরে থিতু হয় রূপি। অর্থাৎ, মাত্র ৫টি ট্রেডিং সেশনেই ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমেছে ২৩০ পয়সা বা ২.৩০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো মুদ্রার এত বড় পতন সাধারণত বেশ বিরল। এই বছরে এখন পর্যন্ত ভারতীয় টাকার মান ৬ শতাংশেরও বেশি কমেছে।

কেন এই পতন? নেপথ্যে তিন বড় কারণ
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকার এই রেকর্ড পতনের পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ কাজ করছে:

১. ইরান সংঘাত ও অপরিশোধিত তেল: মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম হু হু করে বাড়ছে। গ্লোবাল অয়েল বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩.১৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৯.০৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছে গেছে। ভারত তার প্রয়োজনের সিংহভাগ তেল আমদানি করে, তাই তেলের দাম বাড়লে ডলারের চাহিদা বাড়ে, যার সরাসরি চাপ পড়ে টাকার ওপর।
২. শক্তিশালী মার্কিন ডলার: আমেরিকার বাজারে খুচরো বিক্রি বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল শ্রমবাজারের রিপোর্টের পর ‘ডলার ইনডেক্স’ (যা বিশ্বের প্রধান ৬টি মুদ্রার সাপেক্ষে ডলারের শক্তি মাপে) ০.৩৪ শতাংশ বেড়ে ৯৯.১৫ স্তরে পৌঁছে গেছে। ডলার শক্তিশালী হওয়ায় মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার চটজলদি কমাবে না বলে মনে করা হচ্ছে, যা টাকার জন্য নেতিবাচক।
৩. বাণিজ্য ঘাটতি ও বিদেশি বিনিয়োগ: এপ্রিল মাসে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮.৩৮ বিলিয়ন ডলারে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ২৭.১ বিলিয়ন ডলার। যদিও দেশের রপ্তানি ১৩.৭৮ শতাংশ বেড়ে ৪৩.৫৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, কিন্তু আমদানি তার চেয়েও বেশি (১০ শতাংশ) বেড়ে ৭১.৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া বন্ড বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক বিক্রির প্রবণতাও টাকার পতনকে ত্বরান্বিত করেছে।

টাকা কি তবে সেঞ্চুরি করবে? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
টাকার এই রেকর্ড পতনের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— চলতি বছরেই কি এক ডলারের মূল্য ১০০ টাকা হয়ে যাবে? কারেন্সি মার্কেট বিশেষজ্ঞ অনুজ গুপ্তার মতে, বর্তমান যা পরিস্থিতি তাতে এই বছরের শেষের দিকে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকা ১০০-র স্তর ছুঁয়ে ফেললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ইরানের সমস্যা সহজে মেটার লক্ষণ নেই, ফলে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ভারতের আরও বেশি ডলার খরচ করতে হবে, যা টাকাকে আরও দুর্বল করবে।

অন্যদিকে, মিরায়ে অ্যাসেট শেয়ারখানের রিসার্চ অ্যানালিস্ট অনুজ চৌধুরী জানিয়েছেন, তেলের চড়া দাম এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় আগামী দিনেও টাকার ওপর এই চাপ বজায় থাকবে। তবে স্পট প্রাইস আপাতত ৯৫.৬০ থেকে ৯৬.২০-এর রেঞ্জের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে। পরিস্থিতি খুব বেশি হাতের বাইরে গেলে রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) বাজারে ডলার ছেড়ে টাকার পতন রুখতে বড় পদক্ষেপ নিতে পারে, যা সাময়িকভাবে রূপিকে কিছুটা অক্সিজেন দেবে।