কমিউনিস্টদের ডেরায় ঢুকেই কমিউনিস্টদের দফারফা? কেরলের রাজনীতির সবচেয়ে রহস্যময় ‘চাণক্য’কে নিয়ে তোলপাড় দেশ

ভারতের বামপন্থী রাজনীতির শেষ শক্তিশালী দুর্গ কেরল। আর সেই কেরলের লাল মাটির বুক চিরে যিনি দশকের পর দশক ধরে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে রেখেছেন, তিনি পিনারাই বিজয়ন। জাতীয় রাজনীতিতে অনেক সময় তাঁকে সিপিএমকে ভেতরে ভেতরে ধরাশায়ী করার অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা একনায়কতান্ত্রিক রাজনীতির ধারক হিসেবেও সমালোচনা করা হয়। কিন্তু সমস্ত বিতর্ক, সমালোচনা আর বিরোধীদের আক্রমণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে একজন সাধারণ দিনমজুরের ছেলে আজ কেরলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে উঠলেন, সেই উত্থানের ইতিহাস যেকোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়।
আজকের কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা মোটেও গোলাপ বিছানো ছিল না। কান্নুরের এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণ কীভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পোস্টার বয় হয়ে উঠলেন, তা জানতে গেলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে।
কান্নুরের রক্তক্ষয়ী রাজনীতি ও বিজয়নের উত্থান
কেরলের কান্নুর জেলা রাজনীতিতে বরাবরই অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং হিংসাত্মক এলাকা হিসেবে পরিচিত। সত্তর ও আশির দশকে আরএসএস এবং সিপিএমের মধ্যে চলা ধারাবাহিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই কান্নুর। আর এই কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই উঠে এসেছিলেন পিনারাই বিজয়ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজয়ন কথার চেয়ে অ্যাকশনে বেশি বিশ্বাসী। দলের অন্দরে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে তিনি যে চরম কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
দলের অন্দরেই ‘মাস্টারমাইন্ড’: অচ্যুতানন্দন পর্ব
পিনারাই বিজয়নের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বাঁক ছিল দলেরই অন্যতম প্রবীণ এবং জনপ্রিয় নেতা ভি এস অচ্যুতানন্দনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই। একদিকে ছিলেন আমজনতার প্রিয়, নরমপন্থী মুখ অচ্যুতানন্দন, আর অন্যদিকে ছিলেন দলের রাশ শক্ত হাতে ধরে রাখা কঠোর সাংগঠনিক সম্পাদক পিনারাই বিজয়ন।
অনেকেই মনে করেন, বিজয়ন অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ও সুনিপুণ কৌশলে দলের পলিটব্যুরো থেকে শুরু করে নিচুতলার সংগঠন পর্যন্ত অচ্যুতানন্দনের অনুগামীদের ডানা ছেঁটে দিয়েছিলেন। আদর্শগত লড়াইয়ের আড়ালে সিপিএমের পুরনো কাঠামোকে যেভাবে তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন, সেই কারণেই সমালোচকদের চোখে তিনি দলের পুরনো লাইনকে ধরাশায়ী করার প্রধান কারিগর বা ‘মাস্টারমাইন্ড’।
লৌহমানব নাকি একনায়ক?
২০১৬ সালে কেরলের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর পিনারাই বিজয়ন নিজের ভাবমূর্তি পুরোপুরি বদলে ফেলেন। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘ক্যাপ্টেন’। করোনা মহামারী এবং কেরলের ভয়াবহ বন্যার সময় তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে ২০২১ সালের নির্বাচনে ইতিহাস তৈরি করে টানা দ্বিতীয়বার কেরলে বামফ্রন্টকে ক্ষমতায় ফেরান তিনি, যা কেরলের রাজনীতিতে বিগত চার দশকে কখনও ঘটেনি।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও তাঁর পিছু ছাড়েনি। সোনা পাচার কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে লাইফ মিশন দুর্নীতি— একাধিক মামলায় তাঁর দফতরের নাম জড়িয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, বিজয়নের জমানায় কেরলের সিপিএম আসলে একটি কর্পোরেট সংস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে দলের চেয়ে ব্যক্তি পুজো বেশি হয়।
সমস্ত সমালোচনাকে একপাশে সরিয়ে রাখলে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে পিনারাই বিজয়ন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। চরম দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছানো এবং রাজকীয় কায়দায় রাজ্য শাসন করার এই ক্যারিশমা সত্যিই রাজনৈতিক মহলে এক গভীর গবেষণার বিষয়।