কালীঘাটের প্রাক্তন ওসির ডেরায় কুখ্যাত ‘সোনা পাপ্পু’! আদালতের কাঠগড়ায় পুলিশ কর্তার কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ফাঁস!

কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি তথা কালীঘাট থানার প্রাক্তন ওসি শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে ঘিরে দুর্নীতির জাল এবার আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিল। জালিয়াতি ও প্রভাব খাটানোর মামলায় ধৃত এই পুলিশ কর্তাকে নগর দায়রা আদালতে পেশ করতেই একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আনল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, পুলিশি দাপট, বিতর্কিত জমি দখল, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক যোগাযোগকে হাতিয়ার করে দীর্ঘদিন ধরে শহরে একটি সমান্তরাল সাম্রাজ্য চালাচ্ছিলেন এই আইপিএস অফিসার। আর এই গোটা চক্রের পেছনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে কুখ্যাত ডন ‘সোনা পাপ্পু’র নাম।

আদালতে ইডির আইনজীবীরা অত্যন্ত কড়া ভাষায় দাবি করেন, কালীঘাট থানার ওসি থাকাকালীন সময় থেকেই এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি করেছিলেন শান্তনু সিনহা বিশ্বাস। পরবর্তীতে কলকাতা পুলিশের ওয়েলফেয়ার বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বসার পর তাঁর সেই প্রভাব ও ক্ষমতা আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অভিযোগ, নিজের প্রশাসনিক পদ ও পুলিশি যোগাযোগকে ব্যবহার করে রাজ্য এবং কলকাতা পুলিশের অন্দরে এক শক্তিশালী ও অসাধু নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, এই চক্রের মূল লক্ষ্য ছিল শহর ও শহরতলির বিভিন্ন বিবাদমান ও বিতর্কিত জমি। প্রথমে জমির আসল মালিকদের নানাভাবে ভয় দেখিয়ে ও আইনি জটিলতার চাপ সৃষ্টি করে জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হতো। কেউ সেই প্রস্তাবে আপত্তি জানালেই আসরে নামানো হতো কুখ্যাত দুষ্কৃতী চক্রকে। এখানেই ওয়ান্টেড অপরাধী ‘সোনা পাপ্পু’র এন্ট্রি ঘটেছিল বলে দাবি ইডির। জোরপূর্বক জমি দখল, হুমকি এবং বেআইনিভাবে রাতারাতি জমি হাতবদলের পেছনে সোনা পাপ্পু ও শান্তনুর এই জুঁটিই মূল কারিগর ছিল।

তদন্তে শুধু জমি জালিয়াতিই নয়, বরং বিপুল পরিমাণ অবৈধ আর্থিক লেনদেনের হদিশও পেয়েছেন আধিকারিকরা। আদালতে ইডি স্পষ্ট জানায়, শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের স্ত্রীর নামে রাজ্যের পাঁচটি নামী সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ক্যান্টিন পরিচালনার বরাত ছিল। কোনো রকম নিয়ম মেনে নাকি স্রেফ স্বামীর প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিপুল লাভজনক বরাত পাওয়া গিয়েছিল, তা এখন আতসকাঁচের তলায়। গোয়েন্দাদের অনুমান, এই ক্যান্টিন ব্যবসার আড়ালেই কোটি কোটি টাকার কালো টাকা সাদা করা হয়েছে।

তদন্তকারীদের তালিকায় রয়েছে একাধিক বহুমূল্য উপহারের হদিশও। আদালতে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে শান্তনুকে কোটি কোটি টাকার বিলাসবহুল উপহার দেওয়া হয়েছিল, যার বড় অংশই এসেছিল ব্যবসায়ী জয় এস কামদারের মাধ্যমে। এই উপহারের বিনিময়ে কামদার বা অন্য কোনো চক্রকে কী সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন এই পুলিশ কর্তা, তা খতিয়ে দেখছেন আধিকারিকরা। এছাড়াও মুর্শিদাবাদে শান্তনুর পৈতৃক বাড়িটি যেভাবে কর্পোরেট কায়দায় সংস্কার করা হয়েছিল, তার পিছনেও প্রায় কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য ইডির হাতে এসেছে। এই বিপুল খরচের উৎস কী, তা জানতে মরিয়া তদন্তকারীরা।

এই হাইপ্রোফাইল দুর্নীতি মামলায় ‘সোনা পাপ্পু’ এবং পুলিশ কর্তার যোগসূত্র সামনে আসতেই নবান্ন থেকে লালবাজার— সর্বত্র তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ইডির ধারণা, এই মেগা স্ক্যামের জল অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং এর পেছনে প্রশাসনের আরও বড় বড় রাঘববোয়ালদের হাত রয়েছে। এই চক্রের গভীরতা এতটাই বেশি যে সত্য উদঘাটনের জন্য শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে ১৪ দিনের নিজেদের হেফাজতে চেয়ে আদালতে আবেদন জানিয়েছে ইডি। আগামী দিনে এই মামলায় আরও একাধিক প্রভাবশালীর নাম সামনে আসতে চলেছে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।

Editor001
  • Editor001