“বাবা আমাদের বাঁচান!” ৪ মাস বিমানবন্দরে বন্দি ৪ শিশু, খুদে লুলুর একটি ভিডিও কীভাবে কাঁপিয়ে দিল আরব দুনিয়া?

নিয়তি যখন দরজায় খিল দেয়, তখন অলৌকিক কিছু না ঘটলে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। চার ফিলিস্তিনি শিশুর ক্ষেত্রে সেই অলৌকিক দেবদূত হয়ে আবির্ভূত হলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। একটি ভাইরাল ভিডিও এবং তাতে এক খুদের করুণ আর্তি—ব্যাস, এইটুকুই যথেষ্ট ছিল খোদ রাষ্ট্রপতির হৃদয় গলাতে। চার মাস ধরে জর্ডানের বিমানবন্দরে কার্যত ‘বন্দি’ থাকার পর অবশেষে নিজেদের ঘরে ফিরল চার ভাইবোন।
স্বপ্ন যখন দুঃস্বপ্ন: বিমানবন্দরের সেই অন্ধকার দিনগুলো
ঘটনার সূত্রপাত চার মাস আগে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দা ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ঈদ সুলেইমান আল আব্বাসি তাঁর সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় জর্ডানে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে জর্ডানে প্রবেশের প্রয়োজনীয় নথিপত্রে ত্রুটি ধরা পড়ে। এর মধ্যেই বাবা সন্তানদের আমিরাতের ভিসা বাতিল করে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। না ছিল জর্ডানে ঢোকার অনুমতি, না ছিল ফেরার রাস্তা।
শিশুরা জানায়, প্রথম ১৬ দিন তাদের বিমানবন্দরের ভেতরেই থাকতে হয়েছিল। এরপর আড়াই মাসের জন্য একটি হোটেলে ঠাঁই হলেও শেষমেশ আবার বিমানবন্দরেই ফিরতে হয় তাদের। চার মাস ধরে পড়াশোনা বন্ধ, অনিশ্চিত জীবন আর প্রবল মানসিক চাপে ভেঙে পড়েছিল খুদে প্রাণগুলো।
“বাবা আমাদের সাহায্য করুন”: একটি ভিডিও এবং ম্যাজিক
যখন সব পথ বন্ধ, তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে একটি ভিডিও বার্তা রেকর্ড করে খুদে লুলু আল-আব্বাসি। ভিডিওতে লুলু আমিরাতের রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি ‘বাবা’ সম্বোধন করে বলে, “আমরা চার শিশু ৪ মাস ধরে বিমানবন্দরে আটকে আছি। আমাদের বাড়ি সংযুক্ত আরব আমিরাত, দয়া করে আমাদের বাঁচান।” সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং সরাসরি পৌঁছায় রাষ্ট্রপতির দপ্তরে।
গভীর রাতের সেই ফোন কল
সন্তানদের বাবা আল-আব্বাসি জানান, তিনি সন্ধ্যায় সাহায্যের জন্য একটি আবেদন পাঠিয়েছিলেন। অবিশ্বাস্যভাবে রাত দেড়টা নাগাদ তাঁর ফোনে একটি কল আসে। কর্মকর্তারা কিছু জরুরি তথ্য নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জানিয়ে দেন, তিনি যেন সন্তানদের ফেরার টিকিট বুক করেন। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কথা তুলতেই কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দেন, শিশুদের জন্য ভিসার কোনো বাধা থাকবে না।
পুরানো ঋণ এবং নতুন জীবন
এটিই প্রথম নয়, এর আগেও ২০০৭ এবং ২০১২ সালে সংকটের সময়ে এই পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ। সেবার আল-আব্বাসির চিকিৎসার সমস্ত খরচ ব্যক্তিগতভাবে বহন করেছিলেন তিনি। সন্তানদের ফিরে পাওয়ার পর আবেগে ভাসছে পুরো পরিবার। লুলু জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি তাদের অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরিয়ে এনেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত যে কেবল একটি দেশ নয়, বরং একটি মানবিকতার ঘর, এই ঘটনা আরও একবার তা প্রমাণ করল। পরিবারটি এখন তাদের দ্বিতীয় বাড়ি আমিরাতে নিরাপদে একত্রিত হয়েছে।