‘বড় বিচিত্র এ-দেশ’, স্বাধীনতা আন্দোলনের গান কেন আজও হিন্দু-মুসলিম বিভেদের শিকার? বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের রচনা নিয়ে ফের কেন প্রশ্ন?

দেশের শত শত সমস্যা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও দেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে লোকসভায় প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে আলোচনা চলার ঘটনাটি গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরেও কেন একটি জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে এত বিতর্ক ও সময় ব্যয় করা হচ্ছে, এবং এটি কি আজও হিন্দু-মুসলিম বিভেদের রাজনীতিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে উৎসাহিত করছে না—এই প্রশ্নই উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই আলোচনার সূচনা করেন। গানটি সম্প্রতি ১৫০ বছর পূর্ণ করেছে।
বন্দে মাতরম-এর ঐতিহাসিক পটভূমি:
রচনা: ১৮৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই গানটি রচনা করেন।
প্রকাশ: এটি প্রথম তাঁর উপন্যাস আনন্দমঠ-এর অংশ হিসেবে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
ঐতিহাসিক মুহূর্ত: ১৮৯৬ সালে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে মঞ্চে এই গানটি গেয়েছিলেন, যা ছিল জাতীয় পর্যায়ে প্রথম প্রকাশ্যে গাওয়া।
এই গান দ্রুত স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার সময় এটি প্রতিটি প্রতিবাদকারীর মুখে ছিল এবং ব্রিটিশদের মধ্যে ভয় জাগিয়ে তুলেছিল। ১৯০৭ সালে ব্রিটিশরা এটিকে নিষিদ্ধ করে।
যেভাবে তৈরি হয়েছিল বিতর্ক:
ব্রিটিশরা তাদের “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতির মাধ্যমে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার জন্য এই গানটিকে ব্যবহার করেছিল।
মুসলিম লীগের বিরোধিতা: ১৯০৯ সালের অমৃতসর সম্মেলনে বন্দে মাতরমের বিরোধিতা করা হয়। রাষ্ট্রপতি সৈয়দ আলী ইমাম এটিকে ইসলামবিরোধী বলে অভিহিত করে সাম্প্রদায়িক ইস্যু তৈরি করেন।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: এই গানের কথায় দেশকে দেবী দুর্গা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল এবং তাকে “রিপুদলবারিণীং” (শত্রুদের ধ্বংসকারী) বলা হয়েছিল। মুসলিম সম্প্রদায় মনে করত ‘রিপু’ শব্দটি তাদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছিল, যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি ব্রিটিশদের বোঝানো হয়েছিল।
ধর্মীয় সংঘাত: মুসলিম লীগ যুক্তি দিয়েছিল যে ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর ভক্তি বা উপাসনার কোনও স্থান নেই, যা এই গানের বিশ্বাসের পরিপন্থী।
বিরোধের সমাধান:
স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত কংগ্রেস দল এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি কমিটি গঠন করে। কমিটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেহেরু, আবুল কালাম আজাদ এবং সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন।
১৯৩৭ সালের সিদ্ধান্ত: কমিটি একটি মধ্যম পথ খুঁজে বের করে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে গানের প্রথম দুটি স্তবক, যার কোনও ধর্মীয় আভাস ছিল না, গাওয়া হবে। প্রথম দুটি স্তবকে কেবল মাতৃভূমির প্রশংসা করা হয়েছে।
জিন্নাহর দাবি: জিন্নাহ ১৯৩৮ সালে নেহেরুকে চিঠি লিখে দাবি জানান যে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি মুসলিম-বিরোধী। যদিও এই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি: অবশেষে, ২৪ জানুয়ারি, ১৯৫০ তারিখে, গানের প্রথম দুটি স্তবক জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে অনুমোদিত হয়েছিল।
এখন এই গানের ১৫০ বছর পূর্তির সময়, এটি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।