“সবাই আসার সুযোগ পাবেন, বাক-স্বাধীনতা সুরক্ষিত”-তসলিমা নাসরিনকে স্বাগত জানিয়ে স্পষ্ট বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

দীর্ঘ ১৯ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে তিলোত্তমা নগরীতে পা রাখলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ও নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শনিবার তাঁর এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে কলকাতার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র রবীন্দ্র সদনে এক বিশেষ নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। লেখিকার অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে অনুষ্ঠানস্থল মুড়ে ফেলা হয়েছিল নিরাপত্তার নিঃছিদ্র চাদরে। তবে সমস্ত আয়োজন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি ছাপিয়ে এদিনের অনুষ্ঠানে প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সমস্ত প্রোটোকলকে দূরে সরিয়ে রেখে নিজেই মঞ্চে উপস্থিত হয়ে লেখিকাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান তিনি।

রবীন্দ্র সদনে তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন
২০০৭ সালে তৎকালীন বাম জমানার আমলে স্বাধীন মতপ্রকাশের অপরাধে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই রবীন্দ্র সদন চত্বরে ছিল সাজসাজ রব। প্রিয় লেখিকাকে দীর্ঘকাল পর চোখের সামনে দেখতে পেয়ে সাধারণ পাঠকদের মধ্যে উন্মাদনা ও আবেগ ছিল চরমে। যে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং কড়া নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করতে গোটা চত্বরটি পুলিশ বাহিনীতে ঢেকে ফেলা হয়েছিল। নাগরিক সমাজ ও বিশিষ্টজনেদের আয়োজিত এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরার প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথাগত রায় এবং রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে সংবর্ধনা মুখ্যমন্ত্রীর
নির্ধারিত সরকারি সূচির বাইরে গিয়ে আচমকাই রবীন্দ্র সদনে হাজির হন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানান যে কোনও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তিনি আসেননি, বরং একজন সাধারণ মানুষ ও রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে লেখিকার প্রতি সম্মান জানাতেই তাঁর এই উপস্থিতি।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমি এখানে আমন্ত্রিত নই। আপনি আসছেন শুনে আমি শুধু মুখ্যমন্ত্রী নই, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের মন্ত্রী হিসেবেও আপনাকে স্বাগত জানাতে এসেছি। আমি ওঁকে স্বাগত জানালাম ‘বন্দে মাতরম’-এর সার্ধ শতবর্ষে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে।” সংবর্ধনার স্মারক হিসেবে সাহিত্য সম্রাটের ছবি তুলে দেওয়ার এই মুহূর্তটি এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও কূটনৈতিক দিক বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

“বাক-স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র সম্পূর্ণ সুরক্ষিত”: শুভেন্দু অধিকারী
পূর্বতন বাম আমলের কড়া সমালোচনা করে নতুন সরকারের অবস্থান অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিগত দিনের সেই ভীতি ও কণ্ঠরোধের রাজনীতি এখন পুরোপুরি অতীত।

লেখিকাকে উদ্দেশ করে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “শৃঙ্খলমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ, বাঁধনমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ যেখানে সংবিধানের প্রতিটি স্তম্ভ সুরক্ষিত। সেই পশ্চিমবঙ্গে সবার আসার সুযোগ রয়েছে, সবার বাক-স্বাধীনতা রয়েছে। নতুন সরকারের হাতে এই বাংলার গণতন্ত্র, সংবিধান, বাক-স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। এখানে কোনওভাবে ধমক-চমক, দেখে নেওয়ার হুমকি বা আটকে দেওয়ার সংস্কৃতি অতীত হয়ে গেছে।”

নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিলেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং
রাজ্যের পুলিশ মন্ত্রী হিসেবে খোদ তসলিমা নাসরিনের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন শুভেন্দু অধিকারী। লেখিকাকে সম্পূর্ণ আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে স্বাগত। আপনি লেখিকা, আপনার লেখা সবাই পড়েন, আপনার বহু গুণগ্রাহী রয়েছে। আপনি এখানে শান্তিতে থাকুন এবং পশ্চিমবঙ্গের যে ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে আপনার অভিজ্ঞতায় আপনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আপনি একবার নয়, বারে বারে আসবেন। এই সুরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গে আপনাকে নিরাপত্তা প্রদানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *