দেবী এখানে চার বোন! গ্রামে হয় ১০০টির বেশি কালীপুজো, কেন পূর্ব বর্ধমানের এই জনপদ পরিচিত ‘কালীগ্রাম’ নামে?

যে গ্রামে একশোরও বেশি কালীপুজো হয়, যেখানে স্বয়ং দেবী কালী চার বোনের রূপে পূজিত হন—সেই জনপদ পরিচিত ‘কালীগ্রাম’ নামেই। পূর্ব বর্ধমানের মেমারির আমাদপুর গ্রামের এই ঐতিহ্য ৪০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। এখানে বড়মা, মেজমা, সেজমা এবং ছোটমা নামে দেবীর পুজো হয়ে আসছে, যা এই গ্রামের প্রধান আকর্ষণ।
গ্রামে প্রবেশ করলেই দেখা মেলে প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার ‘বড় মা’-এর। এরপর প্রায় সম উচ্চতার ‘মেজ মা’ এবং তাঁর আশেপাশে সেজমা ও ছোট মায়ের মন্দির রয়েছে। এই চার দেবী ছাড়াও গ্রামে আরও ১০০টিরও বেশি কালীপুজো হয়, যেমন—সিদ্ধেশ্বরী, বুড়িমা, ডাকাত কালী, ক্ষ্যাপা মা, আনন্দময়ী মা ইত্যাদি ভিন্ন নামে মা কালী এখানে পূজিত হন। এই কারণে আমাদপুর গ্রামটি মানুষের কাছে ‘কালীগ্রাম’ নামেই পরিচিত।
এই প্রাচীন গ্রামে দুর্গাপূজা নয়, বরং কালীপূজোকেই কেন্দ্র করে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে গোটা জনপদ। দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ ভিড় করেন দেবীর পুজো দেখতে এবং বিসর্জনের শোভাযাত্রায় অংশ নিতে।
মেমারির আমাদপুর একটি প্রাচীন জনপথ। কথিত আছে, পূর্বে এখান দিয়েই প্রবাহিত ছিল বেহুলা নদী, যা বর্তমানে মজে গিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। একসময় এই নদীপথ দিয়ে বাণিজ্য তরী যাতায়াত করত এবং বণিকরা প্রায়শই দস্যুদের কবলে পড়ে সর্বস্ব খোয়াতেন। বেহুলা নদীর ধারে ছিল একটি মহাশ্মশান, যেখানে এক সাধু কালীসাধনা করতেন। দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে সেই সাধুর পরামর্শে বণিকরা এই শ্মশানে কালী মায়ের পুজো দেওয়া শুরু করেন। শোনা যায়, এরপর থেকেই তাঁরা দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেতে শুরু করেন এবং দেবীর প্রতি বিশ্বাস জন্মায়, যা কালের সাথে সাথে আরও দৃঢ় হয়েছে।
কালীপুজোর বিসর্জন পর্বেই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ। বড়মা, মেজমা, সেজমা আর ছোটমাকে চতুর্দোলায় করে বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়। সারা রাত ধরে এই শোভাযাত্রা গোটা গ্রাম ঘোরার পর ভোর বেলায় বিসর্জন হয়। এই চার দেবীর পাশাপাশি গ্রামের অন্যান্য দেবীদেরও চতুর্দোলা করে একটির পর আর একটি—এভাবে লাইন দিয়ে শোভাযাত্রা বের করা হয়। পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও মানুষজন এই বিসর্জন দেখতে ভিড় জমান।