চট্টগ্রাম বন্দর চিনের হাতে? টার্মিনাল লিজের সিদ্ধান্তে তীব্র বিতর্ক, ক্ষুব্ধ বিরোধীরা ও ব্যবসায়ী মহল

দেশের বৃহত্তম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি প্রধান টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে পরিচালনার জন্য হস্তান্তরের সরকারি সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯২% যে বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, নির্বাচনের ঠিক আগে সেটির তিনটি টার্মিনাল, যার মধ্যে দু’টি চট্টগ্রাম এবং একটি ঢাকার পাঙ্গাওন টার্মিনাল, বিদেশি কোম্পানির কাছে লিজ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

এই চুক্তির প্রধান অংশীদার হতে চলেছে চিন, যা কৌশলগতভাবে বঙ্গোপসাগরে তাদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করবে। চিন ইতিমধ্যেই ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর অধীনে এই বন্দরে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।

গত ১২ অক্টোবর রাজধানী ঢাকায় এক সেমিনারে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ নিশ্চিত করেছেন যে, লালদিয়া ও নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (চট্টগ্রাম) এবং পাঙ্গাওন টার্মিনাল (ঢাকার কেরানীগঞ্জ)-এর পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তি এই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হবে।

তিনি জানান, লালদিয়া টার্মিনালটি ৩০ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হবে, এবং বাকি দু’টি কন্টেইনার টার্মিনাল লিজ দেওয়া হবে ২৫ বছরের জন্য।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং ব্যবসায়ী মহলে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বিরোধী দলগুলি ছাড়াও বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-র মতো শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠনগুলিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিবৃতি দিয়ে বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশিদের হাতে হস্তান্তর করা কোনও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নয়। এত বড় সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাচিত সংসদ বা সরকারই নিতে পারে।” জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানও এই পদক্ষেপকে ‘জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে’ বলে অভিহিত করেন।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ এই ‘তাড়াহুড়ো’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, টেন্ডার ছাড়াই নিউ মুরিং টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা দেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তিনি কঠোর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “দেশের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত কোনও জাতীয় সম্পদ কোনও অবস্থাতেই বিদেশিদের হাতে হস্তান্তর করা উচিত নয়। কেন এত তাড়াহুড়ো?”

এই সমালোচনার জবাবে নৌপরিবহন সচিব ইউসুফ যুক্তি দিয়েছেন যে, এতে কৌশলগত বা ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনও হুমকি তৈরি হবে না। তিনি উদাহরণ দেন যে, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতেও বিদেশি অপারেটররা বন্দর পরিচালনা করছে।

তিনি বর্তমানে বন্দরের অদক্ষতার কথা তুলে ধরে ব্যাখ্যা করেন যে, বাংলাদেশে গড় সরবরাহ ব্যয় ১৫%, যেখানে বিশ্বব্যাপী এটি মাত্র ৭%। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে চার দিন সময় লাগে। সচিব বলেন, বিদেশি কোম্পানি আসার ফলে জাহাজ পরিবহনের সময় এক দিন কমিয়ে আনা সম্ভব হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন প্রায় ১৫,০০০ ডলার সাশ্রয় করবে। যদিও প্রতি কন্টেইনারের খরচ ১৭০ থেকে ১৮০ ডলার বৃদ্ধি পাবে, তবুও সামগ্রিকভাবে তা লাভজনক হবে।