৩৫০ বছরের রাজকীয় প্রথা! চাঁচল রাজবাড়ির অষ্টধাতুর মা চণ্ডী কেন যান ৪ কিলোমিটার দূরের মন্দিরে? জেনে নিন স্বপ্নাদেশের গল্প!

মালদা জেলার চাঁচল রাজবাড়ির সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো দুর্গাপূজা প্রাচীন রাজকীয় ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। মহাসপ্তমীর ঊষালগ্নে এই রাজবাড়ির মন্দির থেকে এক অভূতপূর্ব শোভাযাত্রার মাধ্যমে অষ্টধাতুর চতুর্ভূজা সিংহবাহিনী মা চণ্ডীকে চার দিনের জন্য নিয়ে আসা হলো প্রায় চার কিলোমিটার দূরের পাহাড়পুর দুর্গাদালানে।
রাজকীয় শোভাযাত্রা ও প্রথা
সোমবার সকালে চাঁচল রাজবাড়ি থেকে মা চণ্ডীকে শোভাযাত্রা করে পাহাড়পুরের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই যাত্রায় রাজ ঐতিহ্য মেনেই কিছু বিশেষ প্রথা আজও বিদ্যমান। যাত্রার শুরুতে সোনার ঝাড়ু দিয়ে মায়ের পথের কিছুটা অংশ সাফ করা হয়। এরপর চাঁদির (রূপোর) পাখায় মাকে হাওয়া দিতে দিতে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দিরে। ঢাক-ঢোল ও ব্যান্ড পার্টির বাজনা সহ এই শোভাযাত্রায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ অংশ নেন। চার কিলোমিটার পথ জুড়ে ছিল লোকারণ্য।
স্বপ্নাদেশ থেকে পুজোর সূচনা
জানা যায়, সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে মালদার উত্তরাংশ সহ বিহারের কিছু অংশের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা রামচন্দ্র রায়চৌধুরী এই পুজোর পত্তন করেছিলেন। কথিত রয়েছে, দেবী চণ্ডী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন যে মহানন্দার সতীঘাটে তাঁর অষ্টধাতুর মূর্তি রয়েছে। রাজমাতাকে দিয়ে সেই মূর্তি নদী থেকে তুলে এনে রাজাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দেবীর নির্দেশ মেনে রাজা সেই মূর্তি রাজবাড়ির মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেবী ফের স্বপ্নাদেশ দেন— রাজবাড়িতে নয়, সতীঘাটে মায়ের মন্দির নির্মাণ করে মৃণ্ময়ী দুর্গার সঙ্গেই সেখানে তাঁকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এরপর রাজার প্রপৌত্র শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরীর নির্দেশে পাহাড়পুরে মায়ের পাকা মন্দির নির্মাণ করা হয়। সেই পুরনো সমস্ত রীতি মেনেই আজও এই পুজো হয়ে থাকে।
দুর্গাদালানে দুই দেবীর আরাধনা
এদিন সকালে মরা মহানন্দায় পাহাড়পুর দুর্গাদালানের কলাবউয়ের স্নান সারা হতেই রাজবাড়ি থেকে বের করা হয় অষ্টধাতুর মা চণ্ডীকে। পাহাড়পুর দুর্গাদালানের পুজোর দায়িত্বে থাকা টিটো বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “রাজবাড়ি থেকে আজ মা সিংহবাহিনীকে এই মন্দিরে আনা হলো। দশমী পর্যন্ত তিনি এখানে থাকবেন। পুরনো রীতি অনুযায়ী এই চারদিন মায়ের স্নান, অন্নভোগ এখানেই হবে। প্রথম থেকেই মহাষ্টমী তিথিতে এখানে কুমারীপুজো হয়।”
এই চারদিন পাহাড়পুর দুর্গাদালানে মৃন্ময়ী মা দুর্গার পাশে অষ্টধাতুর মা চণ্ডীও পূজিত হবেন।
বিসর্জন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
চাঁচলের বাসিন্দা সন্দীপন দাস জানান, দশমীর গোধূলি লগ্নে মৃণ্ময়ী মা-এর বিসর্জন দেওয়া হয় মহানন্দার সতীঘাটে। এই ঘাটেরও রয়েছে এক ইতিহাস— এক রাজমাতার সহমরণের পর থেকেই এই ঘাট সতীঘাট নামে পরিচিত।
বিসর্জনের সময়কালের আরও একটি প্রথা এই পুজোকে বিশেষ করে তোলে। সন্দীপন দাস জানান, “দশমীর গোধূলি লগ্নে মায়ের বিসর্জন হয়। সেই সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ মাকে নদীর ঘাট পর্যন্ত আলো দেখান। আগে লণ্ঠনের আলোয় মাকে পথ দেখানো হতো, এখন দেখানো হয় মোবাইল ফোনের টর্চে।”
চারদিনের জন্য রাজবাড়ির নিত্যপুজারি ভোলানাথ পাণ্ডের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মা চণ্ডী আবার দশমীতে ফিরে যাবেন তাঁর মূল মন্দিরে, যেখানে তাঁর নিত্যপূজা চলতে থাকে।