শ্রীভূমিতে জনসমুদ্র, কিন্তু নজর কাড়ল ‘দহন’! চটের বস্তায় ঢাকা মণ্ডপে মোনালিসার ছবি, কোন গভীর বার্তা দিল দক্ষিণদাঁড়ি ইউথস?

ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকেই লেকটাউন এলাকা পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে। এক দিকে যেমন শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবের জাঁকজমকপূর্ণ থিমে উপচে পড়া ভিড়, ঠিক তেমনই অন্য দিকে দক্ষিণদাঁড়ি ইউথসের গভীর সামাজিক বার্তা সম্বলিত থিম ‘দহন’ দেখতে ভিড় করছেন চিন্তাশীল দর্শনার্থীরা। দুই ভিন্ন স্বাদের পুজোকে কেন্দ্র করেই লেকটাউনে কার্যত স্তব্ধ যান চলাচল।

১. দক্ষিণদাঁড়ি ইউথসের থিম ‘দহন’: অ্যাসিড আক্রান্তদের নীরব আর্তনাদ
এবারের পুজোয় অন্যতম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষিণদাঁড়ি ইউথসের ‘দহন’ থিম। শিল্পী অনির্বাণ দাস তাঁর অসামান্য দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন অ্যাসিড আক্রান্তদের লড়াই ও তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনি। মণ্ডপের আলো-আঁধারিতে এই গভীর বার্তা ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত দর্শনার্থীরা।

‘দহন’ কী এবং কেন?

এই থিমের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সমাজে নারীদের উপর ঘটে যাওয়া অ্যাসিড হামলা, গার্হস্থ্য হিংসা ও ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারার মতো অন্ধকার দিকগুলি তুলে ধরেছেন। যেখানে প্রতি বছর গড়ে ২০০-৩০০ জন মহিলা অ্যাসিড হামলার শিকার হন এবং প্রতিদিন নথিভুক্ত হয় প্রায় ৩৮০-র বেশি গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনা। লোকলজ্জার ভয়ে সমাজের চোখে যা গোপনে থেকে যায়, সেই ‘দহন’কে প্রতীকী রূপ দেওয়া হয়েছে এই মণ্ডপে।

শিল্পীর অভিনব ভাবনা

গোলাকৃতি মণ্ডপপ্রাঙ্গণটির একটি বড় অংশ ঢাকা হয়েছে চটের বস্তা দিয়ে। ঘানার শিল্পী ইব্রাহিম মাহামার শিল্পভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়ে, পরিত্যক্ত চট-কাপড়কে এখানে সামাজিক বঞ্চনার প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে— যা কিছু সুন্দর, তা যেন ঢেকে দেওয়া হয়েছে এই চটের আড়ালে।

সবচেয়ে প্রতীকী উপস্থাপনাটি দেখা যায় মণ্ডপের ভেতরে। সেখানে থাকা আয়নাগুলিতে লেপা হয়েছে কাদামাটি। এই কাদামাটি মাখা অস্পষ্ট প্রতিবিম্ব যেন অ্যাসিডদগ্ধ নারীর ঝলসে যাওয়া মুখ ও অস্পষ্ট দৃষ্টিকে ফুটিয়ে তুলছে।

মণ্ডপের পিছনের দেওয়ালে ঠাঁই পেয়েছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসা, মুঘল মিনিয়েচার ও অজন্তার গুহাচিত্রের মতো বিখ্যাত চিত্রকলা, যেখানে নারীর সৌন্দর্য উদযাপিত হয়েছে। অথচ আবহমানকাল জুড়ে নারীরা জ্বলেছেন অপমানের আগুনে। এই প্রতিবাদী নারীদের লড়াইয়ের ভাষ্যও ফুটে উঠেছে মাটির পুতুলের মাধ্যমে।

তবে সমস্তকিছুর কেন্দ্রে, মা জগজ্জননী রয়েছেন রিক্ত, রুদ্ররূপে। এই রূপ যেন ঘোষণা করছে— এই দহন তাঁরও বুকে বাজে, আর তাঁকেই ঘিরে ‘অগ্নিজাদের’ লড়াইয়ের শক্তি আজও অটুট।

২. শ্রীভূমি স্পোর্টিং: জনসমুদ্রে অক্ষরমধুর জৌলুস
অন্যদিকে, লেকটাউনেরই আরেক প্রান্তে শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব তৈরি করেছে জৌলুসে ভরা জনসমুদ্র। গত সপ্তাহেই বানভাসি কলকাতায় জল ঠেলে যে ভিড় দেখা গিয়েছিল, ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় তা পরিণত হয়েছে জনস্রোতে। ভিড়ের চাপে গোটা লেক টাউন এলাকা স্তব্ধ।

শ্রীভূমির এবারের থিম তৈরি হয়েছে দিল্লির বিখ্যাত অক্ষর ধাম মন্দিরের আদলে। সাদা পাথর কেটে তৈরি ছোট-ছোট নকশার কারুকার্য হুবহু যেন তুলে ধরেছেন শিল্পীরা।

৫৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই পুজো কমিটিতে থিমে জাঁকজমক থাকলেও প্রতিমার সাবেকি ঐতিহ্যে কোনো বদল আসেনি। তবে, এবারের প্রতিমাকে সাজানো হয়েছে হোয়াইট গোল্ড ও হীরে দিয়ে, যা এক অপরূপ রাজকীয় সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। অতীতে বাহুবলি, বুর্জ খলিফা ও ডিজনিল্যান্ডের থিম করে মন জয় করা শ্রীভূমি এবারও ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

আপনারা কি কেবল জাঁকজমকপূর্ণ থিম দেখতে বেশি পছন্দ করেন, নাকি দক্ষিণদাঁড়ির মতো সামাজিক বার্তা বহনকারী থিমও আপনাদের সমানভাবে আকর্ষণ করে?