সিনেমা সমাজের আয়না, কিন্তু সমাজ বদলায় না! বিস্ফোরক দাবি ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’র কণ্ঠস্বর জয়ের

‘Work hard in silence, let your success make the noise’ – প্রবাদটি যেন জয় সেনগুপ্তের জন্যই তৈরি। তথাকথিত তারকাদের ভিড়ে এক ব্যতিক্রমী নাম। মঞ্চ, টেলিভিশন, ওটিটি, বা সিনেমা, সব মাধ্যমেই তাঁর অভিনয় যেন নিঃশব্দে বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। তিনি শতহস্ত দূরে থাকেন তথাকথিত ‘সুপারস্টারের’ তকমা থেকে। কিন্তু জানেন কি, হলিউড সুপারহিরো ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’র হিন্দি ডাবিংয়ে ক্রিস ইভান্স-এর পেছনে কণ্ঠস্বরটি থাকে তাঁরই?
সিনেমা ব্যবসার ‘১০০ কোটি’ ক্লাবের বাইরে থাকা সত্ত্বেও জয় সেনগুপ্তের প্রতিটি কাজ সমাজে মুখোশের আড়ালে থাকা বাস্তবকে তুলে ধরে। ইটিভি ভারতের সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে অভিনেতা অকপটে তুলে ধরলেন তাঁর কাজ, দর্শন এবং বাংলা বিনোদন জগতের ভেতরের নানা দিক।
‘অহনা’র অন্তরালে
নতুন পরিচালক প্রমিতা ভৌমিক পরিচালিত ‘অহনা’ মুক্তির আগেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই ছবিতে সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং জয় সেনগুপ্তের অভিনয় দর্শক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ছবিটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত অভিনেতা জানান, “ছবিটির নারীকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু, অভিনয় এবং উপস্থাপন দর্শককে মুগ্ধ করেছে। সভ্য মধ্যবিত্ত সমাজের মুখোশ খুলে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা দর্শককে ভাবাচ্ছে।”
নতুন পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করা নিয়ে দ্বিধা থাকলেও ‘অহনা’র ক্ষেত্রে জয়ের সিদ্ধান্ত নিতে কোনো সমস্যা হয়নি। “আমি যখন চিত্রনাট্য শুনি, তখনই বুঝেছিলাম এই ছবির সঙ্গে যুক্ত হবই। তবে নতুন পরিচালকদের নিয়ে একটা চিন্তা থাকেই যে তাঁরা টেকনিক্যালি কতটা দক্ষ হবেন। কিন্তু প্রমিতা যেভাবে গল্প বলেছিলেন, তাতে স্বচ্ছতা আর সততা ছিল। তিনি জানতেন কী চান এবং কতটুকু দরকার। তাঁর আত্মবিশ্বাস দেখে আমার সব দ্বিধা কেটে গিয়েছিল,” বলেন জয়।
শিল্প সমাজের আয়না, পরিবর্তনে অক্ষম
‘অহনা’ ছবিতে জয়ের চরিত্রটি ‘নীল’ নামের এক সোশিওলজিস্টের, যার প্রগতিশীল মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে পুরুষতন্ত্রের বীজ। স্ত্রীর সাফল্যে তার হীনম্মন্যতা প্রকাশ পায়, যা তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটায়। শেষে মুখোশ খসে পড়ে এবং জমা দুঃখ-বিদ্বেষের বিস্ফোরণ ঘটে।
জয় সেনগুপ্তের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই ছবি কি সমাজে কোনো পরিবর্তন আনবে? তাঁর স্পষ্ট জবাব, “পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেই আসে। শিল্পের কাজ হলো সমাজের সামনে আয়না তুলে ধরা। যদি দর্শক সেই আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেও মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহলে কিছু করার নেই। সিনেমার কাজ কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া, যার উত্তর দর্শককে নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে। প্রতি বছর দুর্গা পূজা হয়, কিন্তু সবাই তো দুর্গা হয়ে যায় না। সমাজের ক্ষত যেমন ছিল তেমনই থাকে।”
টলিউডে ‘নোংরামি’র অভিযোগ
গত কয়েক বছরে বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রিতে রাজনীতির প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছে বারবার। ফেডারেশনের ‘দাদাগিরি’, টেকনিশিয়ানদের অসহযোগিতা, শুটিং বন্ধ করার মতো ঘটনা ইন্ডাস্ট্রির করুণ ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। এর প্রভাব যে বিনোদন জগতে পড়ছে, তা একবাক্যে স্বীকার করে নিলেন জয়। “সারা বিশ্বে সাংস্কৃতিক রাজনীতি কাজ করে, আর বাংলায় তা আরও বেশি। এখানে বাজারের রাজনীতি এবং রাজনীতির রাজনীতি উভয়ই প্রবল। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশেপাশে থাকলে সুবিধা পাওয়া যায়, আর তার উল্টো দিকে থাকলে অসুবিধাও আছে। ছোট এই ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই নিজেদের জায়গা ধরে রাখতে এবং প্রসারিত করতে চায়। কিন্তু মুশকিল হয় যখন মাত্র দু-তিনজন সেই সুযোগ পায়, আর নতুন প্রতিভাবানরা সেই অঙ্গনে ঢুকতেই পারে না,” জানান তিনি।
জয়ের মতে, নতুন কাউকে সরিয়ে দেওয়ার নোংরা রাজনীতি চলে। সরকারি হল না দেওয়া, মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা তিন দিন পর নামিয়ে দেওয়া, পোস্টার ছিঁড়ে দেওয়া, শো টাইম পরিবর্তন করে দেওয়া – সবই এই নোংরামির অংশ। “এই নোংরামি বন্ধ হলে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অনেক উন্নতি হবে। কিন্তু আমরা একই বাঁধাধরা কাজ আর একই মুখের গণ্ডিতে আটকে থাকি, তাই বাংলা সিনেমার সেইভাবে উন্নতি হয় না,” বলেন তিনি।
২৭ বছরের পথ চলা
১৯৯৮ সালে গোবিন্দ নিহালানি পরিচালিত ‘হাজার চৌরাসি কি মা’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে জয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে তিনি একাধিক হিন্দি ও বাংলা ছবি এবং ওটিটি সিরিজে কাজ করেছেন। এত বছর পর ফিরে দেখলে কী মনে হয়? “আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন আমার যে দর্শন ছিল, আজও তা একই আছে। আমি নিজেকে বিক্রি করতে যাইনি, পার্টি করে নেটওয়ার্কিং করে কাজ খুঁজিনি। আমি আমার কাজ দেখিয়ে কাজ পেয়েছি,” বলেন জয়।
তিনি আরও জানান, “যতটা অন্যরা কাজ করেছে, আমি তার অর্ধেকেরও কম কাজ করেছি। কিন্তু আমি গর্বিত যে যতটুকু কাজ করেছি, তার ৭০ শতাংশ নিয়ে আমি গর্বিত। ‘পাতালঘর’ সিনেমাটি আমার মৃত্যুর পরেও সার্থক হয়ে থাকবে। আমি জানতাম না যে অভিনয় জগতে এত লম্বা কেরিয়ার পাব। এখন আমি আরও বেশি থিয়েটার করি। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি বিনোদন জগতে কাজ বেড়েছে। ‘ব্ল্যাক ওয়ারেন্ট’, ‘খাকি’, ‘নাইট ম্যানেজার’, ‘আরিয়া’, ‘হ্যালো’, ‘প্রফেসর সেনগুপ্ত’-র মতো কাহিনি-সিরিজে কাজ করেছি। আর এটাই আমার আসল অর্জন।”
প্রচারবিমুখ জয়
জয় সেনগুপ্ত নিজেকে প্রচারবিমুখ বলেই মনে করেন। তাঁর কথায়, “আমি নিজেকে বিক্রি করতে পারি না। আমি আমার আগ্রহের বিষয়গুলো শেয়ার করতে পারি, কোনো ছবি নিয়ে কথা বলতে পারি, কিন্তু আমার বাইরের আবরণটা বিক্রি করতে পারব না। কারণ আমি ইমেজে বাঁচি না, আমি আসলটা দেখি। লোকে তাতে আগ্রহী হতেও পারে আবার নাও পারে।”
অনুপ্রেরণা
জয় সেনগুপ্তের অনুপ্রেরণার তালিকায় রয়েছেন প্রয়াত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বলরাজ সাহানি, ওম পুরী এবং নাসিরুদ্দিন শাহ। নাসিরুদ্দিন শাহের সঙ্গে তিনি সম্প্রতি ‘মেড ইন ইন্ডিয়া- দ্য টাইটান স্টোরি’ সিরিজে কাজ করেছেন, যা শীঘ্রই অ্যামাজন ভিডিওতে মুক্তি পাবে। এছাড়া, তরুণ বয়সে অমিতাভ বচ্চনের ছবি দেখে বড় হওয়া জয় ‘আলাদিন’ ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছোট্ট একটি চরিত্রেও অভিনয় করেছেন। এভাবেই বড় বড় তারকাদের কাজ থেকে শিখে তিনি নিজের অভিনয় সত্তাকে আরও শাণিত করে চলেছেন।