রাজ্যের কোষাগারে বাড়ছে চাপ, সরকারি দপ্তরের খরচে এবার রাশ টানছে নবান্ন

রাজ্য সরকারের কোষাগারের উপর বাড়তি চাপ এবং কিছু দপ্তরের ‘অতিরিক্ত’ খরচ নিয়ে অসঙ্গতি নজরে আসার পরই কঠোর পদক্ষেপ নিল নবান্ন। এবার থেকে বিভিন্ন দপ্তরের টাকা খরচের ঊর্ধ্বসীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে স্বাধীনভাবে বড় অঙ্কের প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা হারাবে দপ্তরগুলি। এই মর্মে অর্থ দপ্তর একটি কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে, যা রাজ্যের আর্থিক শৃঙ্খলার উপর জোর দিচ্ছে বলে প্রশাসনের ব্যাখ্যা।

কেন এই কড়াকড়ি?
রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে বারবার জানিয়েছে যে, কর্মচারীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) দেওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি তাদের নেই। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও অর্থাভাবে ডিএ দেওয়া যাচ্ছে না বলে রাজ্য দাবি করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থ দপ্তরের পর্যবেক্ষণ, বেশ কিছু দপ্তর সরকারের কোষাগারের অবস্থা বিবেচনা না করেই খরচ করে চলেছে। প্রকল্পের বাছবিচার বা খরচের সঠিক রিভিউ পর্যন্ত করা হচ্ছে না।

এর উপর রয়েছে কেন্দ্রের বকেয়া। গত তিন-চার বছর ধরে ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা, সড়ক যোজনার মতো একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। এই প্রকল্পগুলি রাজ্য নিজেদের কোষাগার থেকে অর্থ দিয়ে চালাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথীর মতো একগুচ্ছ সামাজিক প্রকল্প, যা রাজ্যের আর্থিক জোগানের ক্ষেত্রে চাপ আরও বাড়িয়েছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি সামাল দিতেই নবান্ন টাকা খরচে রাশ টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন নির্দেশিকা: কার কত সীমা?
কোনও প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সর্বোচ্চ কত টাকা অনুমোদন দিতে পারবে, তার জন্য ২০২৩ সালে একটি নির্দেশিকা জারি করেছিল রাজ্য। সেই নির্দেশিকাই এবার সংশোধন করা হয়েছে, এবং দপ্তরের সচিব ও প্রধান সচিবদের অনুমোদন ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে।

নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী:

পূর্ত, সেচ, পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ, পুর ও নগরোন্নয়ন-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলি এখন থেকে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকার প্রকল্পে অনুমোদন দিতে পারবে। নতুন প্রকল্প হোক বা চলমান প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ – সবক্ষেত্রেই এই ঊর্ধ্বসীমা প্রযোজ্য। ২০২৩ সালের নির্দেশিকায় এই অঙ্ক ছিল ৫ কোটি টাকা।

উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন, সুন্দরবন উন্নয়ন এবং পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দপ্তরের কাজের ক্ষেত্রে এই ঊর্ধ্বসীমা ১ কোটি টাকা করা হয়েছে। আগের নির্দেশিকায় যা ছিল ৩ কোটি টাকা।

আবাসন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME), তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বসীমা ধার্য করা হয়েছে ৭৫ লক্ষ টাকা।

বাদবাকি অন্যান্য দপ্তরের ক্ষেত্রে ৫০ লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারিত করেছে নবান্ন।

অর্থসচিব প্রভাতকুমার মিশ্রের স্বাক্ষরিত এই নির্দেশিকায় এ-ও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উপদেষ্টার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এই পদক্ষেপের ফলে রাজ্যের আর্থিক শৃঙ্খলা আরও মজবুত হবে এবং প্রকল্পের খরচ আরও যুক্তিসঙ্গত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, এর ফলে প্রকল্পের রূপায়ণে গতি কতটা প্রভাবিত হবে, তা সময়ই বলবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *