“১২ বছরের ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ৫ কিশোরের বিরুদ্ধে”-নাবালকদের যৌন অপরাধ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ভারতের উত্তরপ্রদেশে ১২ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঁচ ছাত্রের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর দেশজুড়ে নাবালক কর্তৃক যৌন অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ছাত্ররা সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির এবং তাদের বয়স ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এই ঘটনার ভিডিও করে তা ভাইরাল করার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশের পরিদর্শক মনীশ সাক্সেনা সাংবাদিকদের বলেছেন, ভুক্তভোগী ছাত্রী দলিত সম্প্রদায়ের। তার মেডিক্যাল টেস্ট করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত পাঁচজন নাবালককেই হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তারাও দলিত সম্প্রদায়ের এবং প্রত্যেকেই হেনস্থার শিকার ছাত্রীর বাড়ির কাছেই থাকে। তাদের জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের কাছে পেশ করা হবে।
মাদকের প্রলোভন ও স্কুলের ভেতরে অপরাধ
গত ৮ মে এই ঘটনা ঘটলেও তা প্রকাশ্যে আসে কয়েকদিন আগে, যখন ছাত্রীর মাকে তারই এক প্রতিবেশী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ঘটনার ভিডিও দেখান। এরপর পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে ছাত্রীর পরিবার।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দিন ওই ছাত্রী বাড়ির কাছের মাঠে খেলছিল। তাকে মাদক মিশ্রিত কোল্ড ড্রিঙ্ক খাওয়ানোর পর কাছের এক স্কুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ আরও জানতে পেরেছে যে, অভিযুক্তদের মধ্যে একজনের পরিবারের সদস্য ওই স্কুলে কর্মরত। সেই কর্মীর কাছ থেকে কোনোভাবে চাবি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। অভিযুক্তরা ঘটনার ভিডিও করে এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয় ওই ছাত্রীকে।
সাম্প্রতিক ঘটনার তালিকা: উদ্বেগ বাড়াচ্ছে দেশের চিত্র
গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে অল্পবয়সীদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ উঠেছে:
- সুলতানপুর, উত্তরপ্রদেশ (চলতি মাস): ১৪ বছর বয়সী এক নাবালিকাকে তিনজনের ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে। জাতীয় মহিলা কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই মামলায় রিপোর্ট তলব করেছে।
- বেলাগাভি, কর্ণাটক (চলতি মাস): ১৪ বছর বয়সী এক নাবালিকাকে তিনজনের ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে দু’জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। বেলাগাভির পুলিশ কমিশনার ইয়াদা মার্টিন মারবনইয়াং জানিয়েছেন, ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তও অপ্রাপ্তবয়স্ক।
- চেন্নাই (চলতি মাস): ১৩ বছর বয়সী এক কন্যাকে পেটে ব্যথার কারণে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক বুঝতে পারেন যে সে অন্তঃসত্ত্বা। পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে, ওই নাবালিকাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এই ঘটনায় ১২ জনের নাম উঠে আসে, যাদের মধ্যে ছয়জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে।
শিশু অধিকার কর্মী প্রশান্ত কুমার দুবে বলেন, “অল্পবয়সীদের মধ্যে যৌন অপরাধের প্রবণতা কিন্তু চিন্তা বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নাবালকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে একটা বড় অংশ হলো যৌন অপরাধ। এর মধ্যে যৌন হেনস্থা এমনকি ধর্ষণও রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো একাধিক ঘটনায় অভিযুক্তদের বয়স ১২ থেকে ১৪ বা তারও নিচে। এই বিষয়টা নিয়ে কিন্তু আমাদের ভাবতেই হবে।”
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য: উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
ন্যাশানাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (NCRB) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৫ হাজার ৩৫২টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল, যেখানে অভিযুক্তরা অপ্রাপ্তবয়স্ক। এনসিআরবির তথ্য বলছে, ২০২২ সালে নথিভুক্ত হওয়া মামলার মধ্যে যৌন হয়রানি-সহ আইপিসির সেকশন ৩৫৪ ধারায় নথিভুক্ত মামলার সংখ্যা ৮৭৪ এবং ধর্ষণের মামলা ১ হাজার ১৩০টি। নাবালকদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে তাতে ৭৯.৩ শতাংশের বয়স ১৬ থেকে ১৮ বছর। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে নথিভুক্ত হওয়া মোট মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮২৮টি।
পশ্চিমবঙ্গের জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেছেন, “এনসিআরবির সর্বশেষ তথ্য ২০২২ সালের। আমার ধারণা, সাম্প্রতিক সময়ের তথ্য প্রকাশ পেলে ওই সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তাছাড়া রিপোর্টে উল্লেখ করা মোট মামলার সংখ্যা দেখে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অপরাধের প্রবণতা কমেছে এমন ভাবার কারণ নেই। ওই সামান্য সংখ্যার তারতম্য নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ রয়েছে বলে আমি মনে করি না। আর যে সংখ্যক ঘটনা ঘটে, তার চেয়ে অনেক কম মামলা দায়ের হয়।”
কেন বাড়ছে এই অপরাধ প্রবণতা? বিশেষজ্ঞদের মত
জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের ওই সদস্য বলেছেন, “সাম্প্রতিক সময়ে অল্পবয়সীদের মধ্যে যৌন অপরাধের প্রবণতা সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ। একদিকে যেমন যৌন হেনস্থার ঘটনায় ১২ থেকে ১৪ বছরের অভিযুক্তরা চিন্তা বাড়াচ্ছে তেমনই, অপরাধের ধরনও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের মধ্যে গণধর্ষণ যেমন রয়েছে তেমনই ঘটনার সময় হেনস্থার শিকারদের তীব্র আঘাত, পুরো ঘটনা মোবাইলে ভিডিও করে তা প্রকাশ করার হুমকি, এমনকি খুনের অভিযোগ রয়েছে। নিগ্রহের শিকারদের মধ্যে নাবালক ও নাবালিকা উভয়ই রয়েছে, যদিও মেয়েদের সংখ্যা অনেক বেশি।”
মধ্যপ্রদেশের শিশু অধিকার কর্মী প্রশান্ত কুমার দুবে প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্টের (POCSO) অন্তর্গত একাধিক মামলা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, “এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে অপরাধের ধরন দেখলে শিউরে উঠতে হয়। ভাবতে অবাক লাগে এত অল্প বয়সে তারা এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এমন ঘটনাও রয়েছে যেখানে একজন নাবালক প্রথমে নিজে মেয়েটিকে নিগ্রহ করেছে এবং পরে তার বন্ধুদের গিয়ে একই কাজ করতে বলেছে।”
তিনি এই অপরাধ প্রবণতার কারণ হিসাবে একাধিক বিষয় উল্লেখ করেছেন:
- অবাধ ইন্টারনেট অ্যাক্সেস ও অনুপযোগী কন্টেন্ট: দুবে বলেছেন, “অবাধ ইন্টারনেট অ্যাক্সেস, সেখানে যৌনতায় পরিপূর্ণ কন্টেন্ট, যা তাদের বয়সের জন্য উপযোগী নয়, ওই কন্টেন্ট নিয়ে কী করবে তা বুঝতে না পারা, অল্প বয়সে মাদক-সহ বিভিন্ন ধরনের আসক্তি; এমন একাধিক বিষয় জড়িত রয়েছে।”
- কোভিড-১৯ এর প্রভাব: “কোভিডের সময় থেকে এই সমস্যা বেড়েছে কারণ অন-লাইন ক্লাসের জন্য বাচ্চাদের হাতে ইন্টারনেট কানেকশন -সহ মোবাইল বা কম্পিউটার দিতে হয়েছে। কিন্তু তার এই অপব্যবহার নতুনভাবে সমস্যার জন্ম দিয়েছে।”
- অভিভাবকদের নজরদারির অভাব: অনেক অভিভাবকই মোবাইল, কম্পিউটার বা টিভিতে ‘প্যারেন্টাল লকের’ বিষয়ে জানেন না। বাবা-মা দু’জনই কর্মরত থাকলে ২৪ ঘণ্টা নজরে রাখা সম্ভব হয় না। গ্রামাঞ্চলে অনেক অভিভাবকই প্রযুক্তির দিক থেকে সড়গড় নন।
- মানসিকতার পরিবর্তন: দুবে বলেন, “ইন্টারনেটে থাকা ভিডিওতে যা দেখছে, বাস্তবেও সেটা প্রয়োগ করতে চায় এবং সহপাঠী বা অন্য মেয়েদের নিশানা করে।” তিনি চিন্তাধারা বদলের প্রসঙ্গও এনেছেন। সমাজকর্মী ও অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষও এই বিষয়ে তার মতামত জানিয়েছেন। তার কথায়, “মেয়েরা ভোগ্যবস্তুর মতো, তাদের দমিয়ে রাখা যায়; এই জাতীয় চিন্তা কিন্তু একটা বড় কারণ বলে আমি মনে করি। আমরা মেয়েদের আত্মরক্ষা শেখার কথা বলি কিন্তু বাড়ির ছেলেদের শেখাই না যে তোমরা মেয়েদের এইভাবে দেখো না। এই চিন্তা যদি আমরা এখনও না বদলাই তাহলে কবে বদলাব?”
সমাধানের উপায়: সম্মিলিত প্রচেষ্টা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের গভীরে যে কারণ রয়েছে, সেই বিষয়ে ভাবতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ সত্যগোপাল দে বলেছেন, “সমস্যার কারণ হলো আমরা মাথাব্যথার জন্য ওষুধ দিচ্ছি কিন্তু তার কারণ খুঁজে বের করছি না। বয়ঃসন্ধিকালে বয়সোপযোগী যে সমস্ত বিষয় নিয়ে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত আমরা তা এড়িয়ে চলি। যেহেতু একেবারে শিশুবয়স থেকেই ছেলে-মেয়ে দু’জনকেই নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাই তাদের কিছু কথা জানিয়ে রাখা দরকার। অবশ্যই তাদের বয়সের কথা মাথায় রেখে।” তিনি জোর দেন যে, অভিভাবকদের উচিত শিশুদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা, বিশেষত বয়ঃসন্ধিকালে, এবং তাদের বোঝানো যে মেয়েরা কেবল ভোগ্যবস্তু নয়, তারাও মানুষ।
প্যারেন্টিং কনসালটেন্ট পায়েল ঘোষ বাবা-মায়ের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “নতুন প্রজন্ম একাকীত্বে ভোগে। তাদের সমস্যা এবং অভিব্যক্তির বিষয়ে শোনার মতো মানুষ কম। অভিভাবকদের জাজমেন্টাল না হয়ে সন্তানের সমস্যার কথা শোনা এবং গঠনমূলক আলোচনা করা দরকার।” তিনি আরও বলেন, অনলাইন গেম বা অন্যান্য ডিজিটাল কন্টেন্ট যা শিশুদের মনে প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। বাড়িতে গার্হস্থ্য হিংসা বা শারীরিক নিগ্রহও শিশুদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি বিকৃত চিন্তার জন্ম দিতে পারে।
ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের ভূমিকার কথা বলেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার কথায়, “মা-বাবার নজরে রাখা উচিত তার সন্তান ইন্টারনেটে কী দেখছে। না বকাবকি করে তাদের বুঝিয়ে বলা দরকার কেন তা তাদের দেখা উচিত নয়। যদি অভিভাবক প্রযুক্তির বিষয়ে না জানেন, তাহলে তাদের এমন কারও সাহায্য নেওয়া দরকার যিনি সেই বিষয়ে পারদর্শী। মোবাইল হাতে দিয়ে দিলেই হবে না, অভিভাবককেই দায়িত্ব নিতে হবে যাতে তার সন্তান এমন কিছুর সামনাসামনি না হয়ে পড়ে যা তার জন্য ক্ষতিকারক।”
(বিবিসি বাংলা থেকে সংগৃহীত তথ্য)