“ভুটানের সঙ্গে ৪০০০ কোটির চুক্তি”-চিনের প্রভাব রুখতে বড় মাস্টারস্ট্রোক ভারতের!

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভুটানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে বড় পদক্ষেপ করল ভারত। থিম্পুতে অনুষ্ঠিত ভারত-ভুটান পঞ্চম উন্নয়ন সহযোগিতা বৈঠকে স্বাক্ষর হলো ১২টি নতুন প্রকল্প সংক্রান্ত সহযোগিতা এবং ৪,০০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি বা ‘লাইন অফ ক্রেডিট’ (LoC)। শুক্রবার ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি এবং ভুটানের শীর্ষ নেতৃত্ব— রাজা জিগমে খেসর নামগিয়াল ওয়াংচুক, প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং বিদেশ ও বাণিজ্যমন্ত্রী লিয়নপো ডিএন ধুংগিয়েলের উপস্থিতিতে এই ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামো উন্নয়ন অংশীদারি সংক্রান্ত সমঝোতাগুলি স্বাক্ষরিত হয়।

ত্রিদেশীয় কূটনীতি ও ভুটানের ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা

বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন, ভুটানের ত্রয়োদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেই এই নতুন প্রকল্পগুলির কাজ শুরু হবে এবং সেই অনুযায়ীই ঋণ প্রদান করা হবে। অতীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শপথ নেওয়ার পর ভুটানের সঙ্গে ভারতের ‘বিশেষ এবং অনন্য’ সম্পর্কের কথা বারবার তুলে ধরেছেন। তবে গত কয়েক বছরের ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে নেপালের মতো ভুটানেও ধীরে ধীরে চিনের প্রভাব বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মাঝেই বিদেশসচিবের এই দু’দিনের থিম্পু সফর এবং একগুচ্ছ নতুন চুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঘটনাচক্রে, গত ২৭-২৮ জুলাই নিজের চিন সফর শেষ করেই ভুটানে পা রেখেছিলেন বিদেশসচিব।

আর্থিক সাহায্য ও পরিকাঠামো উন্নয়নের রূপরেখা

বিদেশ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভুটানের নতুন ১২টি উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ৩৩২ কোটি টাকা আর্থিক সাহায্য বা অনুদান দেবে ভারত। পাশাপাশি, জ্বালানি প্রকল্পগুলির রূপায়ণের জন্য ভুটান সরকার এবং ভারতের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট (Exim) ব্যাঙ্কের মধ্যে ৪,০০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

নতুন এই ১২টি প্রকল্পের আওতায় মূলত যে ক্ষেত্রগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেগুলি হলো:

  • পরিকাঠামো উন্নয়ন

  • স্বাস্থ্য পরিষেবা ও চিকিৎসা গবেষণা

  • কৃষি ও নাগরিক পরিষেবা

  • দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

উল্লেখ্য, এই সফরেই স্বাস্থ্য-গবেষণা ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে ভারতের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS) এবং ভুটানের ‘খেসর গয়ালপো ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস’-এর মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। এছাড়া, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে ভুটান সরকারকে ভারতের পক্ষ থেকে ‘গ্রিন মোবিলিটি’ কর্মসূচির অধীনে ৪৫টি বৈদ্যুতিক যান (EV) উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

চিনা আগ্রাসন ও ভারতের রণকৌশল

উল্লেখ্য, প্রায় এক দশক আগে ডোকলাম (Doklam) এলাকায় ভুটানের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেছিল চিনা সেনা, যা নিয়ে ভারত ও চিনের লালফৌজের মধ্যে তুমুল সামরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি বিগত বছরগুলিতেও ডোকলাম ও সংলগ্ন সীমান্তবর্তী ভুটানি জমিতে বেজিংয়ের পক্ষ থেকে অবৈধভাবে গ্রাম নির্মাণের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বের এই ভূ-রাজনৈতিক পরিসরে চিনা প্রভাব এবং আগ্রাসী মনোভাব রুখতেই ভুটানকে নিয়মিত ও ধারাবাহিক অর্থসাহায্য দিয়ে পাশে থাকার নীতি নিয়েছে নয়াদিল্লি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *