“রাজনীতিতে হয়, পুলিশেও গ্রুপবাজি!”-প্রশাসনিক বৈঠকে বসে কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রী মমতার

রাজনৈতিক নেতাদের মতো পুলিশও যদি ‘লবিবাজি’ বা ‘গ্রুপবাজি’তে জড়িয়ে পড়ে, তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না—এমনই স্পষ্ট বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকাল শিলিগুড়ির অদূরে ফুলবাড়িতে রাজ্য সরকারের উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক ভবন উত্তরকন্যায় আয়োজিত এক প্রশাসনিক বৈঠকে কোচবিহারের পুলিশ সুপার দ্যুতিমান ভট্টাচার্যের সামনেই তিনি জেলা পুলিশে ‘লবিবাজি’র প্রসঙ্গ তোলেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্য পুলিশ মহলে কার্যত তোলপাড় শুরু হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, কোচবিহারের পুলিশ সুপারই জেলার ডিএসপি (হেড কোয়ার্টার্স) চন্দন দাসকে কোনো কাজ করতে দিচ্ছেন না। তিনি প্রতিদিন অফিসে এসে চা খেয়েই বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। মুখ্যমন্ত্রীর সন্দেহ, ‘লবিবাজি’র কারণেই এই পুলিশকর্তা কাজ করতে পারছেন না।
উষ্মা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জেলার আইন–শৃঙ্খলা যাঁদের দেখার কথা, সেই পুলিশেরই একটি অংশ রাজনৈতিক নেতাদের মতো লবিবাজিতে নেমে পড়ছে।”
এদিন প্রশাসনিক বৈঠকে আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আচমকাই মমতা জানতে চান, কোচবিহারে চন্দনবাবু বলে কেউ চাকরি করেন কি না। এরপর সরাসরি কোচবিহারের এসপি-র উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেন: “হেড কোয়ার্টারকে আপনি কোনো কাজ করতে দেন না।” দৃশ্যত বিব্রত পুলিশ সুপার অস্বীকার করার চেষ্টা করলেও মুখ্যমন্ত্রী জোর গলায় বলেন, “না, উনি কোনো কাজ করেন না। আপনিই তাঁকে কোনো কাজ করতে দেন না।”
বিস্মিত মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, “পুলিশই যদি নিজেদের মধ্যে গ্রুপ তৈরি করে ফেলে, তা হলে সাধারণ মানুষ বাঁচবে কী করে?” ওই পুলিশ আধিকারিককে দিনহাটা, শীতলখুচির মতো এলাকায় কাজে লাগানোর নির্দেশ দেন তিনি। জেলায় সীমান্ত এলাকায় কাজের সুযোগ দিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
খানিকটা স্বগতোক্তির ঢঙে মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “পুলিশ কি নিজেদের মধ্যে গ্রুপ করে? রাজনৈতিক নেতারা করে। আমরা সেটাই জেনে এসেছি এতদিন।” ওই আধিকারিককে কেন এদিনের প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকা হয়নি, তা নিয়েও পুলিশ সুপারের কাছে কৈফিয়ত চান মমতা।
পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে, রাজ্য পুলিশে এই ‘গ্রুপবাজি’ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ‘প্রোমোটি আইপিএস’ এবং ‘ডিরেক্ট আইপিএস’ অফিসারদের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন থাকেই। সেখানে অনেক সময় নিচুতলার পুলিশের একাংশও জড়িয়ে পড়েন। এছাড়াও, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবশালীর ঘনিষ্ঠ পুলিশ অফিসারদের মধ্যেও গ্রুপবাজির অভিযোগ ওঠে। বাম আমলেও পুলিশের এই লবিবাজির অভিযোগ উঠেছে এবং প্রশাসনিকভাবে মাঝেমধ্যে কড়া বার্তা দেওয়া হলেও এই সমস্যা দূর করা সম্ভব হয়নি।
তবে এভাবে প্রকাশ্যে পুলিশে গ্রুপবাজির কথা মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বলে দেওয়ায় আগামী দিনে নিচুতলার পুলিশ মহলে কী প্রভাব পড়ে সেটাই দেখার। বিরোধীরা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে বলছেন, “উনিই পুলিশমন্ত্রী। উনিই যদি বলেন, পুলিশে গ্রুপবাজি চলছে, তা হলে তো ব্যর্থতার দায় ওঁর এবং ওঁর পুলিশকর্তাদেরই। তাঁরা কি এই দায় নিয়ে পদত্যাগ করবেন?”
এদিনের বৈঠকে পুলিশি ব্যবস্থার পাশাপাশি সিকিম প্রসঙ্গও উঠে আসে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিকিমকে স্পষ্ট বার্তা দেন যে, বাংলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তারা যেন কোনো হস্তক্ষেপ না করে।