মুর্শিদাবাদে হিংসা শুরু করেন TMC নেতাই, দর্শক ছিল পুলিশ! চাঞ্চল্যকর তথ্য রিপোর্টে

মুর্শিদাবাদে ওয়াকফ সংশোধনী আইনের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক হিংসার তদন্তে কলকাতা হাইকোর্ট গঠিত তিন সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি একটি চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এই রিপোর্টে একাধিক তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে হিংসায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এমনকি, হিংসা চলাকালীন পুলিশের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগের সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে।
কলকাতা হাইকোর্ট মুর্শিদাবাদ হিংসার তদন্তের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রেজিস্ট্রার যোগিন্দর সিং, রাজ্য জুডিশিয়াল সার্ভিসেসের সচিব অর্ণব ঘোষাল এবং রাজ্য জুডিশিয়াল সার্ভিসেসের রেজিস্ট্রার সৌগত চক্রবর্তীকে নিয়ে এই তিন সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং দল গঠন করেছিল। কমিটির এই রিপোর্টে মুর্শিদাবাদের সাম্প্রদায়িক হিংসাকে স্পষ্ট ভাবে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্টে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধুলিয়ান পৌরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান এবং তৎকালীন প্রশাসক মেহেবুব আলম গত ১১ এপ্রিল হিংসা ছড়িয়েছিলেন। রিপোর্টে আরও জানানো হয়েছে, এলাকার শাসকদলের নেতারা বা পুলিশ এই হিংসা বন্ধ করতে কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং, মেহেবুব আলম নিজেই দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে হিংসা ছড়িয়েছেন বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিটির মতে, ১১ এপ্রিল দুপুরের পর আক্রমণ আরও তীব্র হয়। এমনকি, ১১ এপ্রিল একজন তৃণমূল বিধায়ক হিংসাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেও কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ফিরে যান, যার ফলস্বরূপ পরদিনও হিংসা অব্যাহত ছিল।
কমিটির রিপোর্টে পুলিশের ভূমিকা গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মুর্শিদাবাদে যখন আক্রান্তদের বাড়ি, দোকান এবং মন্দির ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন পুলিশ ছিল দর্শকের ভূমিকায়। আক্রান্তদের আর্তচিৎকার শুনেও পুলিশ দাঙ্গাকারীদের রুখতে কোনো পদক্ষেপ করেনি।
জাফরাবাদে বাবা ও ছেলের হত্যাকাণ্ডের কথাও রিপোর্টে বিশদে জানানো হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, দাঙ্গাকারীরা হরগোবিন্দ দাসের বাড়িতে গিয়ে কুড়ুল দিয়ে কুপিয়ে দরজা ভাঙে এবং এরপর বাবা ও ছেলেকে কুড়ুলের কোপ মারা হয়।
ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র বেতবোনা গ্রামেই ১১৩টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মন্দিরেও ব্যাপক ভাঙচুর হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে সাধারণ মানুষকে নদী পেরিয়ে মালদা জেলায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে, সমস্ত আক্রান্তদের ক্ষতির পরিমাণ সমান নয়, তাই সবার জন্য একই ক্ষতিপূরণ ঘোষণা না করে, প্রত্যেকের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সমীক্ষা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।
প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের গুজরাটের গোধরা পরবর্তী হিংসায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছিল, যার জেরে আদালত সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। যদিও দীর্ঘ তদন্তের পর নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। মুর্শিদাবাদের এই রিপোর্ট নতুন করে রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।