“ট্রাভেলের আড়ালে গুপ্তচরবৃত্তি!”-নিজের ভিডিওতে নিজেই ফাঁসলেন জ্যোতি, কি করে হলো পর্দাফাঁস?

নেট দুনিয়ায় ‘ট্র্যাভেল উইথ জো’ (Travel with Joe) নামে পরিচিত ট্রাভেল ব্লগার জ্যোতি মালহোত্রাকে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI)-এর হয়ে চরবৃত্তির গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আরও অবাক করার বিষয় হলো, তার নিজেরই পোস্ট করা একটি ভিডিও থেকে মিলেছে চরবৃত্তির প্রাথমিক প্রমাণ, যার ভিত্তিতে পুলিশ তাকে হাতে হাতকড়া পরিয়েছে। বলা যায়, নিজের জালেই নিজেই ফেঁসে গিয়েছেন তিনি।

জ্যোতি মালহোত্রা দীর্ঘদিন ধরে একজন ট্রাভেল ব্লগার হিসেবে সক্রিয় ছিলেন এবং ইউটিউবে তার একটি জনপ্রিয় চ্যানেল রয়েছে। তিনি ভ্রমণ সংক্রান্ত বিভিন্ন ভিডিও পোস্ট করে ফলোয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। একাধিক বার তিনি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানেও ভ্রমণ করেছিলেন এবং সেখানকার রাস্তাঘাট, খাবার, পর্যটনস্থলের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করতেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই ব্লগিংয়ের আড়ালে তার ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ ছিল এবং তিনি আসলে পাকিস্তানের হয়ে চরবৃত্তি করছিলেন।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং পুলিশের নজরে আসার পর তাকে চরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এই কুকীর্তি আড়াল করতে গিয়ে তিনি নিজেই ফেঁসে গিয়েছেন। কারণ, তার বিরুদ্ধে চরবৃত্তির মূল প্রমাণ মিলেছে তার নিজেরই পোস্ট করা একটি ভিডিওতে। জানা গেছে, গত বছর নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনে একটি ইফতার ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে জ্যোতি মালহোত্রা অংশ নিয়েছিলেন। সেই ইফতার পার্টি এবং তার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি একটি ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন।

ওই ভিডিওটিতে জ্যোতিকে পাকিস্তান হাই কমিশনের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছে, যার নাম এহসান-উর-রহিম ওরফে দানিশ। এই পাকিস্তানি অফিসারকে এর আগে চরবৃত্তি এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং ভারত সরকার তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে যে জ্যোতি এই পাক অফিসার রহিমের স্ত্রীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলির প্রাথমিক অনুমান, ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সীমান্তের ওপারে পাঠাতে এই রহিমই সম্ভবত জ্যোতির মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।

২০২৪ সালের ৩০ মার্চ পোস্ট করা ওই ভিডিওটিতে জ্যোতি পাকিস্তান হাইকমিশনের ইফতার পার্টির বর্ণনা দিয়েছে। রহিমের সঙ্গে ভিডিওতে জ্যোতিকে যেভাবে কথা বলতে দেখা গিয়েছে এবং তাদের কথোপকথন শুনেই তাদের পূর্ব পরিচিতি এবং ঘনিষ্ঠতা স্পষ্ট হয়। এমনকি, ওই লাইভ ভিডিওতেই এই ব্লগারকে পাকিস্তান হাই কমিশনের অফিসারের কাছে ভিসা চাইতে দেখা যায়, যা গোয়েন্দাদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত করে।

এই ভিডিও এবং অন্যান্য একাধিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতেই দিল্লি পুলিশ জ্যোতি মালহোত্রাকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের অভিযোগ, এই ইউটিউবার একাধিকবার পাকিস্তান গিয়ে সেখানকার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে দেখা করে ভারতীয় সেনা ও সামরিক সংক্রান্ত বিভিন্ন গুপ্ত তথ্য পাচার করেছে। জ্যোতির ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিওগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তিনি মাস দুয়েক আগেও, অর্থাৎ পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার ঠিক আগে, পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। অটারি-ওয়াঘা সীমান্ত পেরিয়ে সেদেশে প্রবেশ, লাহোরের বিখ্যাত আনারকলি বাজার, পাক পঞ্জাবের ঐতিহাসিক কটাস রাজ মন্দির ঘুরে দেখার মতো ভিডিও তার চ্যানেলে রয়েছে। এছাড়াও তিনি পাকিস্তানের খাবার এবং ভারত ও পাকিস্তানের সংস্কৃতির তুলনা করেও একাধিক ভিডিও তৈরি করেছিলেন।

ব্লগিংয়ের আড়ালে চরবৃত্তির এই ঘটনা সামনে আসায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আরও সতর্ক হয়েছে। পুলিশ ধৃত জ্যোতি মালহোত্রাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার অন্যান্য কার্যকলাপ এবং নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে।