‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে’র থেকে ‘অপারেশন সিন্দুর’ কোথায় আলাদা?-জেনেনিন মূল পার্থক্য সম্পর্কে

২২ এপ্রিলের পহেলগাম জঙ্গি হামলায় নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির যোগ্য জবাব দিতে মঙ্গলবার মধ্যরাতে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত এই অভিযান শেষ করে ভারতীয় সেনা নিজেদের এক্স হ্যান্ডলে লিখেছে, ‘Justice Served’ (ন্যায়বিচার সম্পন্ন হয়েছে)। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অভিযান ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা ২০১৯ সালের এয়ার স্ট্রাইকের থেকে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং কৌশলগতভাবে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু এই পার্থক্যগুলো ঠিক কোথায়? আসুন জেনে নেওয়া যাক।

অপারেশনের প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য:

মঙ্গলবার মধ্যরাতে যখন পাকিস্তান গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় ‘অপারেশন সিন্দুর’। এই অভিযান ছিল পহেলগামে নিরীহ মহিলা পর্যটকদের স্বামী-হারা করার মতো মর্মান্তিক ঘটনার পাল্টা জবাব। এই অভিযানে পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের মুজাফ্‌ফরাবাদ, কোটলি, বাহাওয়ালপুর, রাওয়ালকোট, চাকসওয়াড়ি, ভিম্বার, নীলম ভ্যালি, ঝেলাম ও চকওয়াল সহ মোট ৯টি ভিন্ন ভিন্ন জঙ্গি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। মোট ২৪টি বিধ্বংসী মিসাইল মাত্র ২৫ মিনিটের মধ্যে আছড়ে পড়েছে এই স্থানগুলিতে।

মূলগত পার্থক্য: ব্যাপকতা ও সমন্বিত শক্তি

প্রাক্তন সেনা কর্তাদের মতে, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মূলগত পার্থক্য হলো এর ব্যাপকতা এবং ভারতীয় বাহিনীর তিনটি শাখার সমন্বিত প্রয়োগ। ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা ২০১৯ সালের এয়ার স্ট্রাইকে মূলত একটি বা সীমিত সংখ্যক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছিল। ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে স্থল পথে জওয়ানদের একটি ছোট দল পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে ঢুকে সুনির্দিষ্ট জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করেছিল। ২০১৯ সালের এয়ার স্ট্রাইকে বায়ু সেনা পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের বালাকোট সহ কিছু জঙ্গি ঘাঁটিতে বোমা বর্ষণ করেছিল।

কিন্তু ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ক্ষেত্রে ছবিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অভিযানে স্থল, জল ও বায়ু – ভারতীয় সেনাবাহিনীর তিনটি শাখাই একসঙ্গে সমন্বিতভাবে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের ৯টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। এত বড় মাপের সমন্বিত জবাবি হামলা আগে ভারতীয় সেনাবাহিনী করেনি।

অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার:

এই অভিযানে আগের চেয়ে অনেক বেশি অত্যাধুনিক ও বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতীয় বাহিনী অত্যাধুনিক স্ক্যাল্প ক্রুজ মিসাইল, হ্যামার স্মার্ট বম্ব এবং লুটারিং মিউনিশন বা কামিকাজে ড্রোনের মতো অস্ত্র ব্যবহার করেছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই সমস্ত মিসাইল মাত্র ১ ঘন্টার মধ্যে নিজেদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নির্ভুলভাবে আঘাত হেনে লক্ষ্যবস্তু সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়।

কৌশলগত পরিবর্তন ও বার্তা:

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘অপারেশন সিঁদুর’ কেবল একটি হামলার জবাবি হামলা নয়, এর মাধ্যমে ভারত যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল বদলাচ্ছে, সেটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। তিনটি বাহিনীকে একসঙ্গে নামানো এবং একই সাথে একাধিক লক্ষ্যে আঘাত হানা ভারতের নতুন আগ্রাসী নীতির ইঙ্গিত দেয়। এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু পাকিস্তান নয়, গোটা বিশ্বকে একটি জোরালো বার্তা দেওয়া হয়েছে যে ভারত আর সন্ত্রাসবাদীদের কার্যকলাপ বরদাস্ত করবে না এবং তাদের পরিকাঠামো ধ্বংস করতে যেকোনও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

সব মিলিয়ে, ‘অপারেশন সিঁদুর’ প্রমাণ করেছে যে ভারত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরও বেশি সমন্বিত, ব্যাপক এবং প্রযুক্তি-নির্ভর কৌশল গ্রহণ করছে, যা আগের অভিযানগুলির চেয়ে এটিকে কৌশলগতভাবে ভিন্ন উচ্চতায় স্থাপন করেছে।