দিঘায় গিয়ে মমতার সঙ্গে সাক্ষাৎ! কী হতে পারে দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ?

দিঘায় জগন্নাথ ধাম দর্শন, আর সেখানেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ – এই ঘটনা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির অন্দরে এক নতুন ঝড় তুলেছে। সস্ত্রীক দিলীপ ঘোষের এই সফর এবং তার পরবর্তী ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পরেই রাজ্য বিজেপির কর্মীদের একাংশ তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন। যে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে কর্মী-সমর্থকদের উপর আক্রমণের অভিযোগ তুলে সরব থেকেছেন দলীয় নেতৃত্ব, সেই প্রশাসনের প্রধানের সঙ্গে দলেরই এক শীর্ষ নেতা কী করে এমন হাসিমুখে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করতে পারেন, এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অসন্তুষ্ট কর্মীদের মনে। অনেকের মুখেই শোনা যাচ্ছে দিলীপ ঘোষের তৃণমূলে যোগদান করার জল্পনা।
কিন্তু যিনি সংঘ পরিবারের অত্যন্ত পুরনো এবং পরীক্ষিত সৈনিক হিসেবে পরিচিত, বিজেপির রাজ্য সভাপতি হিসেবে দলকে সাফল্যের নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ‘সংঘের ঘরের ছেলে’ হঠাৎ করে দলীয় কর্মীদের আবেগ এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের কথা চিন্তা না করে কেন মুখ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে দিঘা ছুটে গেলেন? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পিছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ এবং জটিল রাজনৈতিক কাহিনী, যার সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে যোগদানের পর থেকে।
২০১৫ সালে ধূমকেতুর মতো রাজ্য রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছিল দিলীপ ঘোষের। বিজেপি রাজ্য সভাপতি হওয়ার আগে দলের গুটিকয়েক নেতা ছাড়া তাঁকে সেভাবে কেউ চিনত না। সভাপতির দায়িত্ব নিয়েই তিনি সংগঠনকে ঢেলে সাজান এবং দলকে নির্বাচনী সাফল্যের পথে চালিত করেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে যখন দেশজুড়ে প্রবল মোদী হাওয়া বইছিল, সেই সময়ে বাংলায় বিজেপিকে ১৮টি আসনে জয় এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। এই বিপুল সাফল্যের পরই দলের নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে রাজ্য সভাপতির পদ ছাড়তে হয়, যদিও তিনি মেদিনীপুর লোকসভা আসন থেকে জিতে সাংসদ হন। সাফল্যের শিখরে থাকা সত্ত্বেও, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূল থেকে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে যোগদানের পর থেকেই রাজ্য বিজেপিতে ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতে শুরু করে এবং দিলীপ ঘোষের উপর চাপ বাড়তে থাকে। কারণ, দুজনেই অবিভক্ত মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র এবং তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের ক্ষেত্র অনেকটাই একই ছিল।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও, শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতার পদ পান। এর পর থেকেই রাজ্য বিজেপিতে শুভেন্দু অধিকারীর অনুগামীরা ক্রমশ সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলায় দিলীপ ঘোষ ও তাঁর অনুগামীদের উপর চাপ ও কোণঠাসা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সংঘ পরিবারের সদস্য হওয়ায় এবং সংগঠনে দীর্ঘদিনের ভূমিকার কারণে শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি দিলীপ ঘোষকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস দেখাননি। কিন্তু কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁর ‘ঘরের আসন’ মেদিনীপুর থেকে সরিয়ে তাঁকে বর্ধমান-দুর্গাপুরের মতো একটি অপেক্ষাকৃত কঠিন আসনে পাঠানো হয়। এই আসন থেকে ভোটে লড়ে দিলীপ ঘোষের পরাজয় হয়।
নির্বাচনে হারের পরই দিলীপ ঘোষের মুখে শোনা যায় একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য। দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “দল আমার জন্য কী ব্যবস্থা করে দেখব। তার পর সিদ্ধান্ত নেব।” এমনকী নিজের হারের জন্য দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং দলের একাংশের অসহযোগিতাকে কাঠগড়ায় তোলেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, দিলীপ ঘোষের বর্তমান এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে বিজেপির নিজস্ব গঠনতন্ত্র ও পরিচালন পদ্ধতিও দায়ী। বিজেপির মতো দলে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী দল পরিচালনায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করে। এর ফলে বিরোধী বা কোণঠাসা গোষ্ঠীর নেতাকর্মীরা কার্যত অন্তরালে চলে যান বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দিলীপ ঘোষ রাজ্য সভাপতির পদ ছাড়ার পর সায়ন্তন বসু, রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো যে নেতারা তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরাও ক্রমশ ‘নিখোঁজ’ হয়ে গিয়েছেন বা দলের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, এই প্রবণতা দেশের অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে। যেমন গুজরাতে একসময় শক্তিশালী নেতা কেশুভাই প্যাটেলকে সরিয়ে নরেন্দ্র মোদীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর প্রবীণ ওই নেতার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে গিয়েছিল।
কেন্দ্রীয় বিজেপি সূত্রে খবর, পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে দিল্লির নেতৃত্বের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে। তারা এমন নেতৃত্ব তৈরি করতে চাইছে যারা আগামী ১০-১৫ বছর রাজ্যে বিজেপির মুখ হয়ে থাকতে পারবে এবং সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সেজন্যই সুকান্ত মজুমদার এবং শুভেন্দু অধিকারীর মতো অপেক্ষাকৃত কম বয়সী এবং গতিশীল নেতাদের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। আর এই ‘বয়সের দৌড়ে’ কোথাও যেন কিছুটা পিছিয়ে পড়ছেন দিলীপ ঘোষ।
সূত্রের আরও খবর, সম্প্রতি শেষ হওয়া লোকসভা নির্বাচনের পরই রাজ্য বিজেপির সভাপতি পদে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ছিল। দিলীপ ঘোষ হয়তো ভেবেছিলেন, এই কঠিন সময়ে আবারও তাঁর উপর আস্থা রাখা হতে পারে এবং তিনি ফের রাজ্য সভাপতির সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্রে তিনি জানতে পারেন যে, রাজ্য সভাপতি হওয়ার দৌড়ে তিনি নেই। রাজনৈতিক জীবনের এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েই ব্যক্তিগত জীবনে নতুন অধ্যায় শুরুর সিদ্ধান্ত নেন দিলীপ ঘোষ এবং বিবাহ করেন। যে সংগঠনের প্রতি তিনি নিজের জীবন ও যৌবন সমর্পণ করেছেন, তার এই উদাসীনতা ও উপেক্ষা কোথাও যেন তাঁকে একাকীত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। আর রাজ্য বিজেপিতে শুভেন্দু ও তাঁর অনুগামীদের চাপে ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে পড়া দিলীপ তাই শুভেন্দু অধিকারীর মূল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘অছ্যুৎ’ বা এড়িয়ে চলার মতো কেউ মনে করেননি। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তিনি হয়তো মনে করেছেন – ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’।
তবে দিলীপ ঘোষের অনুগামীদের এই ঘটনার পেছনে রয়েছে আলাদা তত্ত্ব। তাঁদের দাবি, দিলীপ ঘোষ একজন প্রকৃত সংঘের লোক। সংঘের কাছে হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্বই হলো প্রধান লক্ষ্য। কে মন্দির প্রতিষ্ঠা করল বা কে করল না, এটা সংঘের কাছে বড় কথা নয়। মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছে, সেটাই তাদের কাছে প্রধান এবং অত্যন্ত ইতিবাচক একটি ঘটনা। আর সেই বৃহত্তর ভাবনা থেকেই দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ ধাম দর্শনে গিয়েছেন দিলীপ ঘোষ। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ কেবলই সৌজন্যমূলক ছিল।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কী করতে পারেন দিলীপ ঘোষ? রাজ্য বিজেপিতে যেখানে তাঁর জন্য স্থান ক্রমশ সীমিত হয়ে আসছে এবং শীর্ষ নেতৃত্বে তাঁর গুরুত্ব কমছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেখানে তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। দিলীপবাবু নিজে এখনও তৃণমূলে যোগদানের ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলেননি। বরং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরেও তিনি বলেছেন যে, প্রয়োজনে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন কিন্তু বিজেপি ছাড়বেন না। রাজ্য বিজেপির এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি হয়তো কোনও সম্মানজনক ‘পুনর্বাসন প্রকল্প’ হিসেবে রাজ্যপালের পদ নিতে পারেন। এমনটা হলে তিনি সক্রিয় রাজ্য রাজনীতি থেকে দূরে গিয়েও একটি সাংবিধানিক পদে থাকতে পারবেন – যা একদিকে যেমন তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবে, তেমনই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকেও তাঁকে দূরে রাখবে। তাতে যেন ‘শ্যাম আর কূল’, দুপক্ষই বজায় থাকে।