‘মজা লাগছে আমার দলের লোকও রাজনীতি করেছে’- মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরই বিস্ফোরক দিলীপ!

বঙ্গ রাজনীতির ময়দানে এখন আলোচনার ভরকেন্দ্রে শুধুই একজন – দিলীপ ঘোষ। দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ দেবের মন্দিরে তাঁর উপস্থিতি এবং সেখানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কই এখন রাজ্য রাজনীতির মূল চর্চার বিষয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের দলের অন্দরেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন বিজেপির এই ডাকাবুকো নেতা। কেন তিনি মন্দিরে গেলেন, কেনই বা রাজনৈতিকভাবে প্রধান প্রতিপক্ষ দলের নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রীর পাশে বসে কথা বললেন – এই প্রশ্ন তুলে তাঁর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে একের পর এক বাঁকা এবং তির্যক মন্তব্য। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দিলীপ ঘোষ কী বলছেন, সেটাই এখন কৌতূহলের বিষয়।
খড়্গপুরের প্রাক্তন সাংসদ দিলীপ ঘোষ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই এই বিতর্কের জবাব দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বাংলার রাজনীতিতে সব বিষয়কেই রাজনীতির নিক্তিতে মাপা হয় এবং তাঁর এই মন্দির যাওয়া নিয়ে দলের লোকেরাও রাজনীতি করছেন দেখে তিনি বেশ মজা পেয়েছেন।
এদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দিলীপ ঘোষ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, “আমি কেন মন্দিরে এসেছি, এটা অনেকের কাছেই কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে! কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই মন্দিরে যাই। আমি মন্দিরে এসেছি, কে সেই মন্দির তৈরি করেছেন সেটা আমার কাছে বড় বিষয় নয়। ভগবানকে সবসময় যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত।” অর্থাৎ, মন্দির দর্শন তাঁর ব্যক্তিগত এবং আধ্যাত্মিক বিষয়, এর সঙ্গে রাজনীতির যোগ টানা অর্থহীন, এমনটাই বোঝাতে চেয়েছেন তিনি।
দলের অন্দরমহল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন দিলীপ ঘোষ। তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আজকে আমাদের দলে এমন কিছু লোক আছেন যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে দিনের পর দিন খেটে এই দলকে আমরা দাঁড় করিয়েছিলাম। এই দালালরা যেদিন থেকে দলে ঢুকেছে, সেই দিন থেকে দল একের পর একটা নির্বাচনে হারছে।” যারা তাঁর দিকে আঙুল তুলছেন, তাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “যারা আমার দিকে আঙুল তুলছে, তারা আগে এর জবাব দিক যে কেন বাংলায় বিজেপির বিধায়ক, সাংসদ, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি সংখ্যা ক্রমশ কমছে।” কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছেন যে যারা দলের খারাপ সময়ে পাশে ছিল না এবং এখন সুবিধাভোগী, তারাই তাঁর সমালোচনা করছে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি নিয়েও তিনি খোলাখুলি কথা বলেছেন। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, “একসময় কালীঘাটে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলেন জননেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী। সেই বাজপেয়ীই আবার শান্তির বার্তা নিয়ে আমাদের ঘোষিত শত্রু রাষ্ট্র পাকিস্তানেও গিয়েছিলেন।” তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজিও আচমকা পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের বাড়িতে গিয়েছিলেন।” এই প্রসঙ্গ তুলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে রাজনীতিতে সৌজন্য এবং প্রয়োজনে প্রতিপক্ষের সঙ্গেও আলাপ আলোচনা নতুন কিছু নয়। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন যে মোদীজি যেমন সৌজন্য দেখিয়েছেন, তেমনই সার্জিকাল স্ট্রাইক বা এয়ার স্ট্রাইকের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। এই সংস্কৃতিতেই তাঁরা বিশ্বাসী বলে জানান দিলীপ ঘোষ। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর আলাদা করে কোনও ‘গোপন মিটিং’ হয়নি, যদিও অনেকেই গোপনে ফোন করে যোগাযোগ রাখেন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তাঁর কথার শেষে কিছুটা আক্ষেপের সুর শোনা যায়। প্রাক্তন সাংসদ বলেন, “২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে রাজ্যের দলের গ্রাফ ক্রমশ নিচের দিকে নামছে। আমরা যেন জিততেই ভুলে গেছি।” তবে একই সঙ্গে তিনি জানান যে তাঁর লড়াই জারি আছে এবং শেষ পর্যন্ত চলবে। শ্রোতাদের বা সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বার্তা দিয়ে বলেন, “আপনারা এবার ঠিক করুন, কার হয়ে লড়াই করবেন।” এর মাধ্যমে তিনি কার্যত দলের বর্তমান পরিস্থিতি এবং নিজের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এক ধরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সব মিলিয়ে, দিঘার জগন্নাথ মন্দির যাওয়া উপলক্ষ্যে শুরু হওয়া বিতর্ক দিলীপ ঘোষকে আরও একবার বঙ্গ রাজনীতির লাইমলাইটে নিয়ে এসেছে এবং তাঁর বক্তব্য দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।