আকাশছোঁয়া সোনার দাম, অক্ষয় তৃতীয়ার আগে বদলাচ্ছে গয়নার বাজার, জেনেনিন পরিস্থিতি?

রাত পোহালেই অক্ষয় তৃতীয়া, বছরকার এই দিনে সোনা কেনা অনেকের কাছেই একটি প্রথা এবং শুভ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু বর্তমানে সোনার যে আকাশছোঁয়া দাম, তাতে এই ঐতিহ্যবাহী চিত্রে বড়সড় বদল আসতে শুরু করেছে। বাজার বিশেষজ্ঞ এবং জুয়েলার্সরা লক্ষ্য করছেন, উচ্চ মূল্য এবং অন্যান্য কারণে গয়নার বাজার এক বড় পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের (জেন-জ়ি) মধ্যে। তারা ভারী ও ঐতিহ্যবাহী সোনার গয়নার বদলে ঝুঁকছে আরও আধুনিক, লাইটওয়েট এবং সাশ্রয়ী বিকল্পের দিকে।
সোনার চড়া দামের বাস্তবতা
ওয়েস্ট বেঙ্গল বুলিয়ন মার্চেন্টস অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন এর হিসেব অনুযায়ী, সোমবার কলকাতায় জিএসটি ধরে ২৪ ক্যারাট (৯৯৫০) গোল্ড বার পোর্শন এর দাম ছিল ৯৮,৮২৮ টাকা প্রতি ১০ গ্রামে। আর ২২ ক্যারাট হলমার্ক গয়নার সোনার দাম ছিল ৯৩,৯৩৬ টাকা প্রতি ১০ গ্রামে। পক্ষকাল আগেও সোনার দাম এক লাখি কোটা ছুঁয়েছিল, বর্তমানে তা কিছুটা নেমেছে ঠিকই, কিন্তু সোনার ছেঁকা যে এখনও বেশ ‘গরম’, তা স্পষ্ট।
গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সোনার দামে ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে। ২০২৩ সালের ২২ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিন শহরে প্রতি ১০ গ্রাম গয়নার হলমার্ক সোনার দাম ছিল ৫৯,৮৪৫ টাকা। পরের বছর, ২০২৪ সালের ১০ মে অক্ষয় তৃতীয়ায় দাম প্রায় ১৬% বেড়ে পৌঁছে গিয়েছিল ৭১,৪০০ টাকায়। সেখানে গত এক বছরে (মে ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫) দাম প্রায় ৩১.৫% বেড়ে সোনা নব্বইয়ের কোঠায় প্রবেশ করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৪ সাল থেকে গত ১২ বছরে দুটি অক্ষয় তৃতীয়ার মধ্যে সোনার দাম বেড়েছে মোট ৯ বছরই। দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চলতি বছরের ৩১.৫% বৃদ্ধির তুলনায় ২০২০ সালে দাম বৃদ্ধি সামান্য বেশি ছিল, প্রায় ৩২%।
সোনার দামের সঙ্গে গয়নার মেকিং চার্জ যোগ করলে দাম আরও অনেক বেড়ে যায়। মেকিং চার্জ গয়নার ধরনের ওপর নির্ভর করে ১৫% থেকে শুরু করে ৪০% পর্যন্ত হতে পারে। গড় হিসেব ধরলেও প্রতি ১০ গ্রাম ২২ ক্যারাট সোনার গয়না কিনতে খরচ প্রায় ১.১৫ লাখ টাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। এই বিপুল খরচ সাধারণ ক্রেতাদের জন্য একটি বড় বাধা।
বদলে যাচ্ছে ক্রেতাদের পছন্দ: জেন-জ়ি মজেছে ফ্যাশনে
বাজার বিশেষজ্ঞমহলের দাবি, সোনার দামের এই ‘র্যাট-রেস’ থেকে নিজেদের সচেতনভাবে সরিয়ে নিয়েছেন ‘জেন-জ়ি’ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ। তারা ঐতিহ্যবাহী, ভারী ও এথনিক ডিজাইনের সোনার গয়নার বদলে আধুনিক হাল ফ্যাশানের ডিজাইনের লাইটওয়েট গয়নার দিকে ঝুঁকছে। তাদের কাছে সোনার ক্যারাট (২৪ বা ২২) এবং হলমার্কের ‘লেগ্যাসি’ ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ১৮, ১৪, এমনকি ৯ ক্যারেট হলেও তাদের চলবে, যদি ডিজাইন ট্রেন্ডি হয় এবং এটি দৈনন্দিন ব্যবহারের পোশাকের সঙ্গে মানানসই হয়। তাদের প্রধান বিবেচ্য হলো গয়নাটি ‘পকেট-ফ্রেন্ডলি’ কিনা।
জেন-জ়ি ক্রেতারা বেস মেটাল কত ক্যারেট, তাতে সিলভার প্লেটিং আছে কিনা, বা সলিটেয়ার ডায়মন্ডের বদলে সিন্থেটিক স্টোন বা জ়িরকোনিয়া বসানো হয়েছে কিনা— এসব প্রশ্নে মাথা ঘামাচ্ছে না। তাদের কাছে স্টাইলিশ, ট্রেন্ডি এবং সাশ্রয়ী হওয়াই যথেষ্ট।
বাজারের সাড়া: অ্যাফর্ডেবল জুয়েলারি ও ফ্যাশন জুয়েলারির রমরমা
ক্রেতাদের এই পরিবর্তিত চাহিদার কথা মাথায় রেখে অর্গানাইজ়ড সেক্টরের নামী জুয়েলার্স যেমন কল্যাণ জুয়েলার্স, সেনকো গোল্ড এবং টাইটান-এর মতো সংস্থাগুলিও অ্যাফর্ডেবল জুয়েলারির (১৮ ক্যারাট এবং নীচে) বাজারে নিজেদের পণ্যসম্ভার নিয়ে এসেছে। এমনকি গত বছর আদিত্য বিড়লা গ্রুপ টাইটানের তনিষ্ক এবং রিলায়েন্স জুয়েলসকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে ‘ইন্দ্রিয়া’ নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রোডাক্ট রেঞ্জ এনেছে, যেখানে ১৮ ক্যারেটের এভরি-ডে ওয়্যার গয়না পাওয়া যাচ্ছে।
কেবল গোল্ড জুয়েলারি নয়, ভারতের ফ্যাশন জুয়েলারি মার্কেট, যাকে ইমিটেশন বা কস্টিউম জুয়েলারিও বলা হয়, সেটিও দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বাজার ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটির এক অবিশ্বাস্য অঙ্কে পৌঁছে যেতে পারে।
এই অ্যাকসেসেবল লাক্সারি ফ্যাশন জুয়েলারির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে দেশি-বিদেশি একাধিক ব্র্যান্ড বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। জিভা, তনিষ্ক (অ্যাফর্ডেবল রেঞ্জ), মেলোরা, আম্রপালি জুয়েলস, কুশলস্, আর্টক্যারাট এবং ইশারা’র মতো ভারতীয় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি ক্যানাডার মেজ়ুরি, ব্রিটিশ ড্যাফাইন, বাই পারিয়া মনিকা ভিনাদের বা মিসোমা, কোরিয়ার অ্যাসট্রিড অ্যান্ড মিয়ু-এর মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও জেন-জ়ি ক্রেতাদের জন্য পকেট-ফ্রেন্ডলি দামে ফ্যাশন জুয়েলারির সম্ভার নিয়ে এসেছে।
শুধু অফলাইন স্টোরেই নয়, অনলাইনেও ফ্যাশন জুয়েলারির বিক্রি বাড়ছে দেদার। ইউবেলা, শাইনিং ডিভা, রুবান্স এবং ইয়েলো কাইম-এর মতো ব্র্যান্ডের তুমুল চাহিদায় ফ্লিপকার্টে ফ্যাশন জুয়েলারির বিক্রি গত বছরের তুলনায় ৫০% বেড়েছে। টাটা ক্লিক, নাইকার মতো পরিচিত প্ল্যাটফর্মগুলির পাশাপাশি বাইসিমরন, পালমোনাস, রুবান্স, আম্প্রপালির মতো নতুন ব্র্যান্ডগুলিও অনলাইনে জনপ্রিয়তা লাভ করছে।
সব মিলিয়ে, সোনার আকাশছোঁয়া দাম এবং তরুণ প্রজন্মের বদলানো পছন্দ গয়নার বাজারকে এক নতুন পথে চালিত করছে। ঐতিহ্যবাহী সোনার গয়নার চাহিদা থাকলেও, ফ্যাশন ও সাশ্রয়ী বিকল্পগুলি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যা আগামী দিনে এই শিল্পের মানচিত্র আরও বদলে দেবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অক্ষয় তৃতীয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী সোনা কেনার দিনেও এবার এই বদলের হাওয়া স্পষ্ট।