“দুঃসময়েও সাধারণ মানুষের সাহায্য”-স্তব্ধ কাশ্মীরে পর্যটকদের মুখে অন্ন তুলে দিলো স্থানীয়রা

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় নিরীহ পর্যটকদের উপর ভয়াবহ জঙ্গি হামলা উপত্যকার পর্যটন-নির্ভর অর্থনীতিকে চরম সংকটে ফেলে দিয়েছে। হামলার জেরে বহু পর্যটক আতঙ্কিত হয়ে কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসছেন বা বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়েছেন। কাশ্মীরিরা কবে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও, এই চরম দুঃসময়েও স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের ঐতিহ্যবাহী অতিথি সৎকারের প্রথা ভোলেননি। আটকে পড়া পর্যটকদের তাঁরা দু’হাতে আগলে রাখছেন এবং সম্ভাব্য সবরকম সাহায্য করছেন।
কলকাতার বাঘাযতীন থেকে কাশ্মীরে বেড়াতে যাওয়া একদল পর্যটকের অভিজ্ঞতায় এই মানবিকতার ছবি উঠে এসেছে। দলের সদস্য পিয়া ঘোষ জানান, রামবানে ধস নামার কারণে প্রথমে তাঁরা হোটেলে আটকে পড়েছিলেন। এর ফলে বৈসরন ভ্যালিতে তাঁদের বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়। পরে মুঘল রোড হয়ে জম্মু ফেরার কথা জানতে পেরে তাঁরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এবং এর ফলেই তাঁরা হামলার হাত থেকে রক্ষা পান।
বুধবার রাতে তাঁদের ট্রেনে করে কলকাতায় ফেরার কথা ছিল, কিন্তু জম্মু স্টেশনে রেল কর্তৃপক্ষ তাঁদের ঢুকতে বাধা দেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা জম্মু স্টেশন লাগোয়া বৈষ্ণবদেবী মন্দিরের ধর্মশালায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে আশ্রয় নেন। পিয়া ঘোষ বলেন, “এলাকার সমস্ত দোকানপাট বন্ধ ছিল। ফুটপাথের দোকানও খোলা ছিল না। বাধ্য হয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষ যে লঙ্গরখানা খুলেছেন, সেখানেই দাঁড়িয়ে দুপুরের খাবার খেলাম।”
জম্মু স্টেশনের কাছে স্থানীয় বৈষ্ণোদেবী মন্দির কমিটি ও স্থানীয় শিব মার্কেটের ব্যবসায়ীরা যৌথ ভাবে একটি লঙ্গরখানা খুলেছেন। সেখানে জম্মু স্টেশনে ট্রেন ধরতে আসা সমস্ত রেল যাত্রী এবং কাশ্মীর থেকে ফেরা পর্যটকদের খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে খাবার খেতে যাতে অসুবিধা না হয়, সে জন্য মাথার উপরে ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। শিব মার্কেটের ব্যবসায়ী ওমপ্রকাশ শর্মা এবং রাজীব গুপ্ত জানান, আচমকা বনধ ডাকার ফলে দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা রেলযাত্রী ও পর্যটকদের স্বার্থে দুপুর থেকে এই লঙ্গরখানা খুলেছেন। রাত পর্যন্ত এটি চলবে, প্রয়োজনে বৃহস্পতিবারও চলবে।
অন্যদিকে, রামবান, পহেলগাম সহ কাশ্মীর উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় মঙ্গলবার থেকেই স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে মোমবাতি মিছিল করছেন। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে এই সব মিছিলে “আমরা সন্ত্রাস চাই না, পর্যটক চাই” স্লোগানটি শোনা যাচ্ছে। আটকে পড়া বহু পর্যটক এই স্লোগানে অনেকটা ভরসা এবং মানসিক শক্তি খুঁজে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
কাশ্মীরে আটকে পড়া পর্যটকদের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘও। জম্মুর ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রধান সত্যমিত্রানন্দ মহারাজ বলেন, মঙ্গলবার জঙ্গি হামলার ঘটনার পর শয়ে শয়ে পর্যটক কাশ্মীর থেকে ফিরে আসছেন। যাদের এখনও দু–তিন দিন ঘোরার কথা ছিল, তারাও আতঙ্কিত হয়ে জম্মুতে ফিরে এসে সেখানে আরও দু-একদিন থেকে নির্ধারিত ট্রেনে বাড়ি ফিরবেন বলে ঠিক করেছেন। ভারত সেবাশ্রমের পক্ষ থেকে তাঁদের থাকা, খাওয়া–সহ সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে।
পহেলগাঁও হামলার ভয়াবহতা কাশ্মীরি জীবন এবং অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করলেও, এই কঠিন সময়ে স্থানীয় কাশ্মীরিদের একাংশ এবং বিভিন্ন সংগঠনের মানবিক প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে যে সন্ত্রাসবাদ উপত্যকার সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারেনি এবং অতিথি সৎকার ও সহানুভূতির ঐতিহ্য আজও অমলিন।