“SSC দুর্নীতি এবং মুর্শিদাবাদের হিংসা”- জোড়া ইস্যুতেও আন্দোলনে ঝাঁজ নেই? ধন্দে পদ্ম শিবির

পশ্চিমবঙ্গে SSC নিয়োগ দুর্নীতি এবং মুর্শিদাবাদে ওয়াকফ (সংশোধনী) আইনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক হিংসার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র চর্চা চলছে। এই দুই ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে কোণঠাসা করতে মরিয়া বিজেপি। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নিয়মিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সমালোচনা করছেন, মুর্শিদাবাদের হিংসাকে “প্রশাসন সমর্থিত” বলে অভিযোগ করেছেন। তবে, বাংলার গ্রাম-গঞ্জে এই ইস্যুগুলিকে হাতিয়ার করে জনমনে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিজেপি কতটা সফল হচ্ছে, তা নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে, শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) কলকাতার সল্টলেকে রাজ্য বিজেপির কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক ডেকেছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
কেন্দ্রীয় নেতাদের কলকাতা সফর
বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা সুনীল বনসল, মঙ্গল পান্ডে, অমিত মালব্য-সহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা বৃহস্পতিবার রাতে কলকাতায় পৌঁছাচ্ছেন। শুক্রবারের বৈঠকে রাজ্যের সব জেলা সভাপতি এবং শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদারের মতো রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। সূত্রের খবর, দিল্লি থেকে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ভার্চুয়ালি এই বৈঠকে যোগ দিতে পারেন। সোমবার রাতে জেলা সভাপতিদের এই জরুরি তলবের কথা জানানো হয়েছে।
বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হল নিয়োগ দুর্নীতি এবং মুর্শিদাবাদের হিংসাকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করা। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের মতে, রাজনৈতিক সুযোগের সদ্ব্যবহারে রাজ্য বিজেপির কিছু কমতি রয়েছে। এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “আরজি করের সময়ে আমরা নাগরিক আন্দোলনের শক্তি দেখেছিলাম। ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি যাওয়া এবং মুর্শিদাবাদের ঘটনার পর বাংলার মানুষ তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। আমরা চাই, জেলায় জেলায় বিজেপির মিছিলে শুধু দলীয় সমর্থক নয়, সাধারণ মানুষও যোগ দিক।”
বিজেপির আন্দোলনের পরিকল্পনা
রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যে আন্দোলনের কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বুধবার সব জেলায় ‘হিন্দু শহিদ দিবস’ পালনের পাশাপাশি, নিয়োগ দুর্নীতির প্রতিবাদে জেলা সদরগুলিতে মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মতে, এই “রুটিনমাফিক” প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। তারা চাইছেন, মুর্শিদাবাদের হিংসা এবং নিয়োগ দুর্নীতির মতো ইস্যুগুলিকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর জন-আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়।
শুভেন্দু অধিকারী এবং সুকান্ত মজুমদারের নেতৃত্বে রাজ্য বিজেপি তৃণমূল সরকারের উপর “স্নায়ুচাপ” বাড়ানোর লক্ষ্যে লাগাতার আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে। গত রবিবার কলকাতায় মুর্শিদাবাদ হিংসা এবং SSC নিয়োগ দুর্নীতির প্রতিবাদে বিজেপি একটি বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছিল, যেখানে শুভেন্দু অধিকারী এবং সুকান্ত মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।
২০২৬ বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতি
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপির লক্ষ্য ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত নিয়োগ দুর্নীতি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগকে জনমনে প্রাসঙ্গিক রাখা। দলের কেন্দ্রীয় নেতা অমিত শাহ এবং জগৎপ্রকাশ নাড্ডা কোনও রাজনৈতিক সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। সূত্রের খবর, শুক্রবারের বৈঠকে শুধু আন্দোলনের রূপরেখা নয়, রাজ্য বিজেপির পরবর্তী সভাপতি নির্বাচনের বিষয়টিও চূড়ান্ত হতে পারে।
যোগী আদিত্যনাথ মুর্শিদাবাদের হিংসাকে “প্রশাসনের নীরবতা” এবং “ধর্মীয় তোষণের ফল” বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “বাংলা জ্বলছে, আর মুখ্যমন্ত্রী নীরব। দাঙ্গাকারীদের জন্য লাঠিই একমাত্র চিকিৎসা।” এই বিষয়ে তৃণমূল নেতা কুনাল ঘোষ পালটা অভিযোগ করে বলেন, “বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি মুর্শিদাবাদে অশান্তি ছড়ানোর জন্য ষড়যন্ত্র করছে।”
চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা
বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মতে, অতীতে তৃণমূলের বিরুদ্ধে একাধিক ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থতার কারণে দলের হাত থেকে সুযোগ হারিয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন জিতলেও, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তৃণমূলের কাছে পরাজিত হয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে দলটি আর কোনও ভুল করতে চায় না। শুক্রবারের বৈঠকে জেলা নেতাদের মতামত নেওয়া হবে, এবং তৃণমূল-বিরোধী আন্দোলনের ঝাঁজ বাড়ানোর উপায় খোঁজা হবে।
মুর্শিদাবাদে তিনজনের মৃত্যু এবং ১৫০ জনের গ্রেফতারের ঘটনা রাজ্যের রাজনীতিকে উত্তপ্ত করেছে। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, এবং বিজেপি এই ঘটনাকে “ধর্মীয় নিপীড়ন” হিসেবে উপস্থাপন করছে। অন্যদিকে, নিয়োগ দুর্নীতিতে ২৬,০০০ শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি যাওয়ায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। এই দুই ইস্যুতে জনগণকে পথে নামানো বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তবে সফল হলে তা ২০২৬ নির্বাচনে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বড় অস্ত্র হতে পারে।