“২ ছাত্রীর জন্য স্কুলে ৭ শিক্ষিকা!”-শিক্ষার্থীর চরম সঙ্কটে চলছে বাংলার এই গার্লস হাইস্কুল

রাজ্যজুড়ে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি হারানোর পরিস্থিতিতে যখন স্কুল পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন প্রধান শিক্ষকরা, তখন এক ভিন্ন চিত্র ধরা পড়ল চিত্তরঞ্জন রেল শহরের একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। চিত্তরঞ্জন হাই স্কুল ফর গার্লস-এ শিক্ষিকা রয়েছেন সাত জন এবং একজন শিক্ষাকর্মী, অথচ সেখানে পড়াশোনা করছে মাত্র দুইজন ছাত্রী।

কয়েক দশক আগে স্থাপিত এই বিদ্যালয়টি ডিভি গার্লস রেল স্কুলের ভবনেই চলছে। এক দশক আগেও এখানে যথেষ্ট সংখ্যক ছাত্রী ছিল, যা গত কয়েক বছরে ২০ থেকে ৩০-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করত। সেই সময় শিক্ষিকার সংখ্যাও ছিল প্রায় ১৫-২০ জন। তবে বর্তমানে স্কুলে ছাত্রী সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র দু’জনে। কিছুদিন আগেই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা অবসর নিয়েছেন। ফলে, সাত জন শিক্ষিকা এবং একজন করণিক মিলেই এখন ধুঁকতে থাকা স্কুলটি চালাচ্ছেন।

কেন এই করুণ দশা?

স্কুলের টিচার ইন-চার্জ শ্রাবণী মণ্ডল এই পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “বহু বছর ধরে স্কুলে বিজ্ঞানের কোনও শিক্ষিকা বা শিক্ষক নেই। বর্তমানে যে দুজন ছাত্রী রয়েছে, তারা দশম শ্রেণির। তাদের বাড়ি ঝাড়খণ্ডে হওয়ার কারণে তারা মাঝেমধ্যে স্কুলে আসে। স্কুলে আমি (ইতিহাস), ভূগোল ও বাংলায় একজন করে এবং ইংরেজিতে দু’জন শিক্ষিকা রয়েছেন। এছাড়াও, একজন ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর রয়েছেন।”

তিনি আরও জানান, “রেলের যে স্কুল ভবনে এখন আমাদের স্কুল চলছে, সেখানে আমাদের জন্য মাত্র দুটি ঘর বরাদ্দ। একটি ঘরে ক্লাস নেওয়া হয় এবং অন্য ঘরে আমরা শিক্ষিকারা বসি। ছাত্রী না থাকলে কি আমাদের ভালো লাগে? তবুও ওই দু’জনের জন্যই প্রতিদিন স্কুলে আসি এবং হাজিরা খাতায় সই করি।”

অন্যান্য সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। তৃণমূল শিক্ষা সেলের স্থানীয় নেতা অর্ধেন্দু রায় জানান, “আগে রেলকর্মী ছাড়াও বহু বহিরাগত চিত্তরঞ্জনে বাড়ি তৈরি করে থাকতেন। তাঁদের মেয়েরা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খণ্ডের মেয়েরা এই স্কুলে ভর্তি হতো। তবে, রেল শহরে বেআইনি নির্মাণ উচ্ছেদের পর সেই পরিবারগুলি অন্যত্র চলে যাওয়ায় ছাত্রীরাও স্কুল পরিবর্তন করেছে।”

স্কুল শিক্ষা দপ্তর কি কোনও পদক্ষেপ নিয়েছে? টিচার ইন-চার্জ শ্রাবণী মণ্ডলের উত্তর, “বছর দেড়েক আগে পশ্চিম বর্ধমান জেলা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিদর্শক আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছিলেন। আমরা সমস্ত তথ্য পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারপর থেকে আর কোনও নির্দেশ আসেনি।” অর্ধেন্দু রায় যোগ করেন, “এই স্কুলে ছাত্রী না থাকার বিষয়টি আমরা বিভিন্ন স্তরে একাধিকবার জানিয়েছি এবং ডেপুটেশনও দিয়েছি। এরপর ডিআই বিষয়টি সরেজমিনে দেখার জন্য এসআই চিত্তরঞ্জনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। একাধিকবার পরিদর্শন হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।”

আসানসোলের অতিরিক্ত জেলাশাসক (শিক্ষা) সঞ্জয় পাল এই বিষয়ে অবগত নন বলে জানান। তিনি বলেন, “বুধবার অফিস খুললেই আমি ডিআইকে ডেকে পাঠিয়ে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”

উল্লেখ্য, প্রায় তিন বছর আগে ‘এই সময়’ পত্রিকায় এই স্কুলের শিক্ষিকাদের অন্য স্কুলে বদলি করা এবং এখানকার ছাত্রীদের পার্শ্ববর্তী স্কুলে পাঠানোর দাবির কথা উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তৎকালীন অতিরিক্ত জেলাশাসক (শিক্ষা) তৎকালীন ডিআইকে বিষয়টি কার্যকর করার নির্দেশ দিলেও, পরবর্তীকালে ওই দুই আধিকারিকের বদলির কারণে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে, ঐতিহ্যবাহী চিত্তরঞ্জন হাই স্কুল ফর গার্লস আজ অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে।