টাইটান্সের ‘ফুটবল’ কোচ নেহরাজি! অকশন থেকে অ্যাকশন, ঠিক যেন ‘ম্যানেজার’-এর মতো!

খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা সব সময়ই তুঙ্গে থাকে। তবে গুজরাট টাইটান্সের সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন একজন নিপাট মাস্টারমাইন্ড – আশিস নেহরা। নিলামের টেবিল থেকে শুরু করে মাঠের অ্যাকশন পর্যন্ত, সর্বত্রই তাঁর উপস্থিতি স্পষ্ট। প্লেয়ার নির্বাচন থেকে শুরু করে ম্যাচের কৌশল তৈরি, সব ক্ষেত্রেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে এর বাইরেও নেহরার আরও একটি বিশেষ ভূমিকা চোখে পড়ার মতো।
অন্যান্য ক্রিকেট কোচের চিরাচরিত ভূমিকা থেকে অনেকটাই আলাদা আশিস নেহরার কার্যপদ্ধতি। সাধারণত ম্যাচের আগে কৌশল নির্ধারণ এবং অনুশীলনের তত্ত্বাবধান করাই বেশিরভাগ কোচের প্রধান কাজ। ম্যাচের সময় তাঁদের ডাগআউটে বসে থাকতে দেখা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রিঙ্কস ব্রেকে বা মাঠের খেলোয়াড়ের মাধ্যমে অধিনায়কের কাছে বার্তা পাঠান। কখনও আবার ডাগআউট থেকেও ইশারায় কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেন।
তবে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ বা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে স্ট্র্যাটেজিক টাইম আউটের সময় কোচ মাঠে এসে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পান। কিন্তু ফুটবলের কোচদের ভূমিকা আরও বেশি সক্রিয়। তাঁরা ম্যাচের সময় টেকনিক্যাল এরিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন এবং খেলোয়াড়দের ক্রমাগত বিভিন্ন নির্দেশ দিতে থাকেন। পুরো খেলার মধ্যে তাঁরা ডুবে থাকেন এবং সারাক্ষণই তাঁদের সক্রিয় দেখা যায়। হাতে গোনা কয়েকজন ফুটবল কোচই ডাগআউটে বসে থাকেন। ক্রিকেটেও কি ধীরে ধীরে এই পরিবর্তন আসতে পারে? বলা মুশকিল।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে অভিষেকেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল কৃতিত্ব রয়েছে মাত্র দুটি দলের। ২০০৮ সালে আইপিএলের পথচলা শুরু হওয়ার পর রাজস্থান রয়্যালস প্রথমবার এই নজির গড়েছিল। ২০২২ সালে সেই তালিকায় আরও একটি নাম যুক্ত হয় – গুজরাট টাইটান্স। যদিও এটি তাদের প্রথম সংস্করণ ছিল না, তবে অভিষেক মরশুমেই বাজিমাত করে তারা। বাইশের আইপিএলে লখনউ সুপার জায়ান্টস এবং গুজরাট টাইটান্স নামে দুটি নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি দল অংশগ্রহণ করে।
হার্দিক পান্ডিয়ার নেতৃত্বে তারুণ্য এবং অভিজ্ঞতার মিশেলে দল গড়ে তোলে গুজরাট টাইটান্স। মহম্মদ শামির মতো তারকা বোলার এবং একঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে শক্তিশালী দল তৈরি করে তারা। ফলস্বরূপ, অভিষেক মরশুমেই আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে টাইটান্স। পরের মরসুমেও তাদের দাপট অব্যাহত থাকে এবং ২০২৩ সালে তারা ফাইনালে ওঠে, যদিও রানার্স-আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। একটি নতুন দলের আইপিএলে যোগদান করে চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং পরের বছরই রানার্স-আপ হওয়া নিঃসন্দেহে বড় কৃতিত্বের পরিচায়ক।
এই সাফল্যের কারিগরদের মধ্যে খেলোয়াড়দের অবদান অনস্বীকার্য। তবে টাইটান্সের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে নেহরার মতো একজন বিচক্ষণ মস্তিষ্ক। অকশন টেবিলে প্লেয়ার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শিতা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনই মাঠের স্ট্র্যাটেজি তৈরিতেও তিনি সমান পারদর্শী। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল, তাঁকে প্রায়শই ফুটবল কোচের মতো আচরণ করতে দেখা যায়। টেকনিক্যাল এরিয়ায় আবদ্ধ না থেকে তিনি মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যান।
অধিনায়ক যদি লং অনে ফিল্ডিং করেন, প্রয়োজন হলে নেহরা সেখানেও গিয়ে কথা বলেন। আবার স্কোয়ার লেগ বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করলেও তিনি সেখানে পৌঁছে যান। স্ট্র্যাটেজিক টাইম আউটের বাইরেও তাঁকে মাঠের আনাচে-কানাচে দেখা যায়। কোনও বোলার রান খরচ করে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগলে, নেহরাজি বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়েও তাঁর কাঁধে হাত রেখে বন্ধুর মতো কথা বলেন, সাহস জোগান। ক্রিকেট মাঠে আশিস নেহরাকে দেখলে মনে হয় যেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ফুটবল কোচ, যিনি দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের মানসিক ও কৌশলগত দিক সামলান।