“ভাতের থালা হাতে বসেছিলাম, হঠাৎ বীভৎস শব্দ…”, ঢোলাহাটের রাতের ভয়াবহতার বিবরণ প্রতিবেশীদের

“ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে ন’টা। ভাতের থালা নিয়ে সবে খেতে বসেছি। আচমকা বীভৎস একটা শব্দ শুনলাম। দৌড়ে বাইরে এসে দেখি পাশের বাড়িটা পুরো দাউ দাউ করে জ্বলছে। ভিতর থেকে ভেসে আসছে প্রচণ্ড চিৎকার। দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাগুলোকে বের করার অনেক চেষ্টা করলাম। পারলাম না। ওখানেই সব শেষ…” সোমবার রাতের ভয়াবহ বিস্ফোরণের বীভৎস দৃশ্য এবং আর্তচিৎকার আজও প্রতিবেশী প্রমীলা বণিকের কানে যেন লেগে রয়েছে। “জানেন, অনেক কষ্ট করে ওদের বাড়ির এক মহিলাকে বাইরে বার করেছিলাম। পুরো শরীরটা জ্বলে গিয়েছিল। আমরা ক’জন কাপড়, চাদর চাপা দিয়ে হাসপাতালে পাঠাই ওঁকে। কিন্তু তাও কিছু করা গেল না,” কথাগুলি এক নিঃশ্বাসে বলতে বলতে গলা ধরে এল প্রতিবেশী এই গৃহবধূর। গতকাল রাতের বীভৎস স্মৃতি যেন এখনও তাড়া করে ফিরছে তাকে। প্রমীলার মতো একই অবস্থা এলাকার আরও অনেকের।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঢোলাহাট থানার অন্তর্গত দক্ষিণ রায়পুরের ৩ নম্বর ঘেরিতে সোমবার রাতে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণে শোকস্তব্ধ গোটা এলাকা। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, বণিক পরিবারের বাড়িতে মজুত রাখা বাজিতে বিস্ফোরণের ফলে পরিবারের ১১ জন সদস্যের মধ্যে আটজনেরই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘদিনের বাজির ব্যবসা ছিল বণিক পরিবারের। যে বাজি তাদের রুটিরুজির উৎস ছিল, সেই বাজির মজুতই যেন তাদের মৃত্যুর পরোয়ানা লিখে দিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিজেদের কারখানায় তৈরি বাজির বিস্ফোরণেই মুহূর্তের মধ্যে প্রায় গোটা পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছে। যদিও সবুজ বাজির আড়ালে অন্য কোনো নিষিদ্ধ বিস্ফোরক তৈরি করা হচ্ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ঘটনার সময় বাড়ির বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন বাজি কারখানার মালিক তুষার বণিক, চন্দ্রকান্ত বণিক ও তাদের মা। এই ঘটনায় জামিন অযোগ্য ধারায় দুই বণিক ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে আটক করা হয়েছে বাজি কারখানার অন্যতম মালিক চন্দ্রকান্ত বণিককে।
দত্তপুকুর, চম্পাহাটি, কল্যাণীর মতো মর্মান্তিক ঘটনার পরেও যে মানুষ সচেতন হননি, ঢোলাহাটের এই ঘটনা তারই আরও এক প্রমাণ। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, বাড়িতে বিপুল পরিমাণে বাজি মজুত করা ছিল। সেই কারণেই আগুন লাগার পর তীব্র বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছে দোতলা বাড়ির চিলেকোঠার ছাদ। দেওয়াল ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় জানলা ভেঙে ভেতরের ভারী আসবাবপত্র ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, এ ভাবে বসতবাড়ির কাছে বিপুল পরিমাণে বাজি ও বাজির মশলা মজুত করা নিয়ে বণিক পরিবারের সঙ্গে বহুবার তাদের মনোমালিন্য হয়েছে। কিন্তু বণিক পরিবার কারও কোনো কথা কানে তোলেনি। সোমবার রাতের ভয়াবহ ঘটনায় যেভাবে গোটা বণিক পরিবার চরম মূল্য চোকাতে বাধ্য হলো, তার পর কোনোভাবেই এলাকায় আর বাজি কারখানা চলতে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
চার শিশুসহ গোটা পরিবারকে হারিয়ে কান্না থামছে না বণিক পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্যদের। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না কেউই। গত রাতের বীভৎস দৃশ্য দেখার পর আর মুখে খাবার তুলতে পারেননি প্রতিবেশী প্রমীলা বণিক। কাউকে বাঁচাতে না পারার গভীর আফসোস তার কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট।